নিউজ ডেক্স : : আজ ২২ অক্টোবর জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস। সরকারীভাবে ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সকাল সাড়ে সাতটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে বর্ণাঢ্য র্যা লির মধ্যদিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল দশটায় ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে এতে প্রধান অতিথি থাকবেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০১৯ উদযাপনের উদ্যোগকে রাষ্ট্রপতি স্বাগত জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ আয়োজন নিরাপদ সড়ক ব্যবহারে জনগণের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।
প্রধানমন্ত্রীর তাঁর বাণীতে সবাইকে ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমি আশা করি, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা দেশের সড়কগুলোকে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলে সড়ক দুর্ঘটনা কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হব। শেখ হাসিনা বলেন, উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো ও পর্যাপ্ত পরিবহন সেবা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিলেও এই সেক্টরের অনিয়ম কমছে না। জানা যায়, সারাদেশে প্রায় ৪২ লাখ বৈধ যানবাহনের বিপরীতে লাইসেন্স আছে ৩৪ লাখ চালকের। অর্থাৎ আট লাখের বেশি চালক অবৈধ। রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের সঙ্গে মিলে চলছে নিষিদ্ধ তিন চাকার অবৈধ যান। এ সঙ্গে আছে চালক সঙ্কট, লাইসেন্স প্রদান ও যানবাহন পরীক্ষায় গলদ, সড়ক নির্মাণে প্রকৌশলগত ত্রুটি, ট্রাফিক আইন না মানা, রাস্তার দুপাশ দখল, বেপরোয়া গতি এবং দুর্ঘটনা রোধে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়া।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্তরে স্তরে গলদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য সবার আগে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া সব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়ার বিকল্প নেই। পাশাপাশি পরিবহন মালিক, শ্রমিক, যাত্রীসহ সব পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা রোধে সচেতন হতে হবে। অন্যথায় নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার বিষয়টি শুধু কথার কথাই থাকবে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচিত। দুর্ঘটনা কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কাগজেকলমে। সড়ক দুর্ঘটনার মতো দুর্যোগ মোকাবেলা করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়।
বিআরটিএ এর তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা ৩৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৯২। এর বিপরীতে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে বিআরটিএ লাইসেন্স দিয়েছে ৪১ লাখ ৭৬ হাজার ৪২৫ গাড়ির। মোট গাড়ির মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সাড়ে ২৭ লাখের বেশি। বাস প্রায় পাঁচ লাখ। আর অটোরিক্সার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৪০২। সব মিলিয়ে আট লাখের বেশি অবৈধ চালক।
রাজধানী ঢাকায় রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত গাড়ির সংখ্যা ১৪ লাখ ৯৩ হাজার ২৩৩। এর মধ্যে ছয় লাখ ৯২ হাজার মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের সংখ্যা ২ লাখ ৮৮ হাজার ৪২০। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেজিস্ট্রেশনভুক্ত সব গাড়িই চলছে। কিন্তু চালক সঙ্কটে ৮ লাখ অবৈধ চালকই গাড়ি চালাচ্ছে। এর বাইরে অবৈধ যানবাহন ও চালকের সঠিক কোন পরিসংখ্যান বিআরটিএর হাতে নেই।
তবে বিআরটিএর সড়ক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক শেখ মাহবুব-ই-রাব্বানী দাবি করেন, সড়ক নিরাপত্তার বিধানের ক্ষেত্রে অগ্রগতি আছে। তিনি বলেন, চালক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আমরা পরিচালনা করছি। পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে আমরা বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। আমরা এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করেছি। আগে যেখানে পাঁচ ম্যাজিস্ট্রেট ছিলো, সেখানে এখন রয়েছেন ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট।
প্রচুর অভিযান চললেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হচ্ছে না বলে মনে করেন সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে গবেষক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল আলম। তার মতে, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য মোটরযান শ্রমিকদের পাশাপাশি মালিক পক্ষকেও অনেকে দায়ী করেন।
২০১৮ সালের সরকারী পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ৫১৪ দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৭ হাজার ২২১, আহত ১৫ হাজার ৪৬৬। সওজের অধীন মোট সড়ক আছে ২১ হাজার ৩০২ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক ৮ হাজার ৮৬০ কিলোমিটার। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সড়কে যথাযথ সাইনসংকেত নেই। কোথাও কোথাও থাকলেও তা ত্রুটিপূর্ণ। অর্থাৎ ৬২ শতাংশ জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে যথাযথ সাইন-সঙ্কেত নেই। এ বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ২৪ হাজার ৯৫৪। ২০১৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। এই হিসাবে দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৬৮ জনের বেশি। যদিও বেসরকারী বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি দুর্ঘটনার সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলা হচ্ছে। আমাদের সময় ডটকম
