উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী : দেশের অগ্রযাত্রা যেন ব্যাহত না হয়

ডেক্স রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তার সরকারের লক্ষ্যই হচ্ছে এমন একটি দেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো গৃহহীন থাকবে না, কেউ না খেয়ে-বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে না এবং সবাই সুন্দরভাবে জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এই অগ্রযাত্রা যেন ব্যাহত না হয়, এটা যেন অব্যাহত থাকে। তাহলেই ধাপে ধাপে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে।

বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে দেশব্যাপী ৪র্থ জাতীয় উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করব আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করব ২০২১ সালে, সে সময়ে বাংলাদেশ হবে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। আর ২০৪১ সালে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে, সেভাবেই আমরা আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন অব্যাহত রেখেছি।

তিনি বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই যে বাংলাদেশ খাদ্য, শিক্ষা ও মেধাসহ সবক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল হবে। সেই লক্ষ্যে দেশকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেয়ার জন্যই আমরা ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ প্রণয়ন করেছি। যাতে উন্নয়নটা টেকসই হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা সবসময় নিজের শ্রম দিয়ে, মেধা দিয়ে এ দেশকে গড়ে তুলতে চাইতেন। তিনি চাইতেন আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তিনি বলতেন, ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত থাকে না। বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে না, ভিক্ষা করে চলবে না।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ এবং তারাই দেশকে আগামী দিনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আজকের তরুণ আগামী দিনে হবে এদেশের কর্ণধার। কাজেই আমাদের সব আয়োজন হচ্ছে এই তারুণ্যের জন্য।

শেখ হাসিনা বলেন, আজ বাংলাদেশের যে উন্নয়ন, সেই উন্নয়ন সম্পর্কে মানুষকে ওয়াকিবহাল করতে হবে। এর সুফলটা যেন তারা ভোগ করতে পারে। এর মাধ্যমে যাতে নিজের ভাগ্য গড়তে পারে, সে বিষয়টা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম লেখাপড়া শিখে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের মেধা দিয়ে নিজেদের ভাগ্য যেমন গড়বে, তেমনি দেশের ভাগ্যও গড়বে। আর সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের দেশব্যাপী এই উন্নয়ন মেলার আয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী এই উন্নয়ন মেলা তরুণ প্রজন্মের জন্য উৎসর্গ করে বলেন, তারা যেন নিজের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়তে পারে। সন্ত্রাস, মাদক বা জঙ্গিবাদ- এসব থেকে মুক্ত থেকে তারা নিজেদের সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

সরকারপ্রধান বলেন, একদম গ্রামীণ জনগণও যেন নিজের ভাগ্যটা নিজে গড়তে পারে, সেজন্য তার সরকার একশ’ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীরও সেখানে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের জাতীয় উন্নয়ন মেলায় এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য থাকছে ‘অনলাইন ডিজিটাল পাঠ সহায়িকা’। এই আধুনিক যুগে, ডিজিটাল যুগে কেউ পিছিয়ে থাকুক, সেটা আমরা চাই না। সেজন্য এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য আমার পক্ষ থেকে একটা উপহার, সেটা হচ্ছে- পরীক্ষার্থীদের জন্য বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে অনলাইন ডিজিটাল পাঠ সহায়িকা।

তিনি বলেন, বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীর জন্য পর্যায়ক্রমে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে ডিজিটাল পাঠ সহায়িকা করে দেব, যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা যে কোনো বিষয় অনলাইনে পেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে ইন্টারনেট, ডিজিটাল সেন্টার চালুসহ কম দামে সবার হাতে ল্যাপটপ-স্মার্টফোন দিতে সরকারের উদ্যোগের তথ্য তুলে ধরেন।

বিভিন্ন ভাষা শিখতে ‘অ্যাপস’ তৈরির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, শুধু ইংরেজি না, ১০টি ভাষায় আমরা একটি অ্যাপ তৈরি করে দিয়েছি, যা অনলাইনে পাওয়া যাবে। এখান থেকে বিভিন্ন ভাষা শেখা যাবে। যারা বিদেশে চাকরি করতে চায়, তারা এখান থেকে ভাষা শিখে নিতে পারবে।

শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান এবং আয়-রোজগারের পথ ও পাথেয়র দিকনির্দেশনা প্রদানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে এ নিয়ে চতুর্থবার সারা দেশে উন্নয়ন মেলার আয়োজন করেছে সরকার। ঢাকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা প্রাঙ্গণ এবং প্রত্যেক জেলা ও উপজেলায় তিন দিনব্যাপী এই মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ভিডিও কনফারেন্সের সঙ্গে ৪টি উপজেলা এবং দেশব্যাপী পাঁচ শতাধিক বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলার উন্নয়ন মেলাগুলো এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলো সংযুক্ত ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন এবং ১০ বছরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। উন্নয়ন মেলার উদ্বোধনের পর বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলা, বাঘেরহাটের ফকিরহাট, নড়াইলের লোহাগড়া ও রংপুরের পীরগঞ্জের স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।

মাশরাফি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ : সকাল ১০টায় ভিডিও কনফারেন্সে লোহাগড়ায় উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি মুর্তজাকে দেশের বড় সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্রিকেটে কত ভালো করছি, মাশরাফি সেখানে নড়াইলের।’ নড়াইলবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদই তো আপনাদের, মাশরাফি।’ উপজেলা পরিষদ চত্বরে নড়াইলের জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ হাফিজুর রহমানসহ অন্যরা।

যুগান্তর ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রাজশাহী : বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজশাহী কলেজ মাঠে উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। জেলা প্রশাসক এসএম আবদুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এমপি আকতার জাহান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপিকা জিনাতুন নেছা তালুকদার, ভূমি সংরক্ষণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সালমা আকতার জাহান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনজিও ব্যুরোর মহাপরিচালক কেএম আবদুস সালাম, বিভাগীয় কমিশনার নূর-উর রহমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহীন আকতার রেনী, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি খুরশিদ হোসেন প্রমুখ।

চট্টগ্রাম : নগরীর এমএ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমন্যাসিয়াম মাঠে উন্নয়ন মেলার বিভিন্ন স্টলে ভিড় জমাচ্ছেন বিভিন্ন বয়সের লোকজন। এর আগে সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস থেকে শোভাযাত্রার মাধ্যমে শুরু হয় মেলার আনুষ্ঠানিকতা। উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এসএম রবিউল হাসান, পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা প্রমুখ।

হবিগঞ্জ : সকাল সাড়ে ১০টায় জেলা কালেক্টরেট ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত মেলা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে সকাল ৯টায় একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে অংশ নেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. আবু জাহির, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ইতি রানী পোদ্দার, হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ প্রমুখ।

আমতলী : বেলা পৌনে ১১টায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন শেষে আমতলীর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও গণমানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আমতলীতে আসার ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইরানের বিদায়ী রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশগুলোর পরস্পরের মধ্যে বিবদমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনে সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ইরানের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস ভাইজি দেহনভি সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাতে গেলে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা, কক্সবাজারে তাদের পুনর্বাসন প্রসঙ্গ ও তাদের মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সফল প্রত্যাবাসন বিষয়েও তার সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরেন।

এর উত্তরে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানও চায় মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে। যাতে তাদের নাগরিকদের নেপিদো বাংলাদেশ থেকে ফেরত নিয়ে যায়। তিনি জানান, তার দেশও বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্যার্থে তহবিল সংগ্রহ করছে। বাসস