গত বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম দিনই সরকারি দল ও বিরোধীদলের মধ্যে বাকবিত-ায় বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে। এই উত্তাপের সৃষ্টি হয়, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে বিরোধীদল এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ ও জামায়াতে ইসলামীর এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জবাবের ধরন থেকে। শফিকুল ইসলাম মাসুদের একটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেয়া এক কথা না’। তার এ মন্তব্যের জেরে বিরোধীদলের এমপিরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। পাশাপাশি হাসনাত আব্দুল্লাহর করা সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো, বুঝতে পারিনি’ এ মন্তব্যেরও তারা প্রতিবাদ করতে থাকেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাদেরকে বেশ কয়েকবার বসতে বললেও তারা প্রতিবাদ করতে থাকেন। বারবার চেষ্টা করেও পরিস্থিতি শান্ত করতে না পেরে তিনি বলেন, এই সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে যেভাবে বাধা দিচ্ছেন, তা ভালো লক্ষণ নয়। পরবর্তীতে স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে বক্তব্য দিতে দিলে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নতুন করে এই শব্দগুলো বলেন নাই। সংসদ অধিবেশন যেদিন থেকে বসা শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই তিনি সবাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না’। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সংসদ অধিবেশনে যে হইচই ও হট্টগোল হয়েছে, তা বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে। জনগণ এই পরিস্থিতি দেখেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে।
এটা ঠিক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদ অধিবেশনের শুরু থেকেই যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে গিয়ে বিরোধীদলের উদ্দেশ্যে সেন্স অফ হিউমার ব্যবহার করে যে মন্তব্য করেন, তা বৃহস্পতিবারের আগ পর্যন্ত মানুষের কাছে খুব একটা সমালোচনা হয়নি। বরং অনেকে তা উপভোগ করেছেন। সচেতন মানুষ বুঝতে পারেন, সংসদকে প্রাণবন্ত করতে এবং জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে গিয়ে তিনি এই ‘সেন্স অফ হিউমার’ ব্যবহার করেন। সরকারি দলের আরও সংসদ সদস্যর বক্তব্যও সাধারণ মানুষ উপভোগ করেন। ফলে জাতীয় সংসদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে গত বৃহস্পতিবার বিরোধীদলের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বডি ল্যাংগুয়েজ ও জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন যে যথাযথ হয়নি, বিরোধীদল তো বটেই সাধারণ মানুষও তা বুঝতে পেরেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও যে বুঝেছেন, তা তার বক্তব্য প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়েছে। স্পিকার যথার্থই বলেছেন, এটা আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে বিরোধীদল ইচ্ছামতো কথা বলতে পারেন। অতীতে পার্লামেন্টে মারামারি ও খুনের মতো ঘটনা ঘটেছে। দেশের মানুষ দেখেছে, আওয়ামী লীগের আমলে জাতীয় সংসদে বিরোধীদল ‘গৃহপালিত বিরোধীদলে’র তকমা পেয়েছে। সরকারিদল ও বিরোধীদল মিলেমিশে একাকার ছিল। জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছিল, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রশংসা আর ‘জি¦ হুজুরে’র সংসদ। সেই সংসদ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর সঙ্গতকারণেই নতুন যে জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সরকারিদল ও বিরোধীদলের মধ্যে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণের সংসদে পরিণত হবে, তাই প্রত্যাশিত ছিল এবং তা হয়েছেও। নতুন প্রেক্ষাপটের এই জাতীয় সংসদ জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সরকারিদল ও বিরোধীদলের মধ্যে যুক্তি-তর্ক এবং গঠনমূলক সমালোচনা উভয়পক্ষই স্বাগত জানিয়েছে, আবার পাল্টা যুক্তি দিয়ে তা খণ্ডণও করা হয়েছে। এতে জাতীয় সংসদের প্রতি জনগণের ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ জন্মেছে। গত বৃহস্পতিবারের হইচই ও হট্টগোল কিছুটা হলেও তার ছন্দপতন হয়েছে। তবে জনগণ প্রত্যাশা করে, তা সাময়িক এবং জাতীয় সংসদ সরকারিদল ও বিরোধীদলের সমন্বয়ে তাদের কল্যাণে কার্যকর থাকবে।
ADVERTISEMENT
দেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হয়নি। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব একটা সন্তোষজনক নয়। মানুষের মধ্যে চাপা হতাশা বিরাজ করছে। তারা ধৈর্য্য ধরে সরকারকে সময় দিচ্ছে। সরকার অর্থনীতি মেরামতের কাজ করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায়, জাতীয় সংসদ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা কাম্য নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ যে পরিসংখ্যান বা তথ্য তুলে ধরে প্রশ্ন তুলেছেন, তা উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, পার্লামেন্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ কিংবা হান্নান মাসউদরা নতুন। তারা তরুণ এবং অভিজ্ঞতা নেই। তারা আন্দোলনের মাঠ থেকে পার্লামেন্টে এসেছেন। সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিদের উচিৎ, তাদের প্রশ্ন ও বক্তব্য সহনশীলতার সাথে দেখা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও বিচক্ষণ পার্লামেন্টারিয়ান। তার উচিৎ, তরুণ এই এমপিদের প্রশ্ন ও বক্তব্য পিতৃসুলভভাবে দেখা। ভুল হলে স্বাভাবিক জবাবের মাধ্যমে তা ধরিয়ে দেয়া। তার এবং সরকারিদলের অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানদের কাছ থেকে তাদের শেখার অনেক কিছু রয়েছে। তারা শিখেই অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এবং দক্ষ পার্লামেন্টেরিয়ানে পরিণত হবে এবং আগামীতে এই দৃষ্টান্ত তুলে ধরবে। তাদের প্রশ্ন ও বক্তব্য নিয়ে সংসদ অধিবেশন যেভাবে উত্তপ্ত হয়েছে, তা কাম্য নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা মনে করি, বিষয়টি মিটমাট হয়ে গেছে। আগামীতে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়ে সংসদ যাতে সুযুক্তি ও তর্কের মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিস্থিতি শান্ত ও আয়ত্তে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে তিনি অনেকটা রূঢ় হয়ে জাতীয় সংসদের টিকে থাকা নিয়ে যে সংশয় ব্যক্ত করেছেন, তা অতিরিক্ত হয়ে গেছে। সংসদের অভিভাবকের এই সংশয় জনগণের মধ্যেও সংশয় ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। পতিত ফ্যাসিস্টদের জন্য তা উল্লাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা অকাম্য। জনগণ চায়, গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে এই জাতীয় সংসদ তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করুক। সংসদ হয়ে উঠুক সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু এবং তাদের কল্যাণে নিবেদিত ।
