ড. কামালের ১০ ডিগবাজি নিয়ে যুবলীগের বিজ্ঞাপন!

ডেস্ক রিপোর্ট: ড. কামাল হোসেন। খ্যাতনামা প্রবীণ আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনা কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। বর্তমানে গণফোরামের সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক। সম্প্রতি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতে সমমনা দলগুলো নিয়ে জাতীয় ঐক্যের একটি ঘোষণাপত্রও প্রকাশ করেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ। এটিই এখন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’ বলা চলে।

চলমান এই আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন ড. কামালকে নিয়ে মঙ্গলবার দেশের একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ।

‘ড. কামাল হোসেনের ১০ ডিগবাজি’ শিরোনামে ওই বিজ্ঞাপনটিতে যুবলীগ দাবি করেছে, বঙ্গবন্ধুর আশির্বাদে রাজনীতিতে উত্থান ঘটলেও আজকাল আওয়ামী লীগ ড. কামালের চক্ষুশূল। তবে এটা নতুন কিছু নয়। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের আদর্শ পরিবর্তনের ইতিহাস নাকি বাংলাদেশের বয়সের সমান!

হঠাৎ কেন এই বিজ্ঞাপন জানতে চাইলে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, হ্যাঁ, আমরা এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছি। জনকণ্ঠের শেষ পাতায় আছে। আমরা কোনো ব্যক্তির সমালোচনা করি না, কর্মের সমালোচনা করি। আর সেখানে আমরা ড. কামাল সাহেবের কর্মগুলো তুলে ধরেছি, যাতে মানুষ ইতিহাস থেকে তার সম্পর্কে জানতে পারে।

পাঠকদের জন্য সেই বিজ্ঞাপনটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত চরিত্র গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আশির্বাদে রাজনীতিতে উত্থান তাঁর। কিন্তু আজকাল আওয়ামী লীগ তাঁর চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবারই প্রথম নয়, কামাল হোসেনের আদর্শ পরিবর্তনের ইতিহাস বাংলাদেশের বয়সের সমান। ড. কামাল হোসেন যে কার ইশারায় নড়েন আর কেন বারবার ডিগবাজি খান তা রাজনৈতিক মহলের মুখরোচক আলোচনার বিষয়। আসুন জেনে নিই মিডিয়ার প্রিয় কিন্তু অজনপ্রিয় এই রাজনীতিবিদের ডিগবাজির ইতিহাস।

ডিগবাজি নাম্বার এক

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কথা হয়েছিল, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ড. কামাল হোসেন একসঙ্গে ভারতে যাবেন। একাত্তরের সময় ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম ড. কামালকে বিষয়টি অবহিত করেছিলেন। ড. কামাল গাড়ি থেকে নেমে আত্মীয়ের বাসায় গেলেন। এর পরদিন থেকে তিনি লাপাত্তা। এক পর্যায়ে লন্ডনে শ্বশুড়বাড়ি চলে গেলেন ড. কামাল। অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরলেন, ড. কামালকে সঙ্গে নিয়েই ফিরলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু প্রথমে ড. কামালকে আইন মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে না থেকে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ছিল ড. কামালের প্রথম ডিগবাজি।

ডিগবাজি নাম্বার দুই

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের আগে ড. কামাল হোসেন হঠাৎ করেই বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কোন অফিসিয়াল ট্যুর কিংবা রাষ্ট্রীয় কাজে নয় ড. কামাল বিদেশে গিয়েছিলেন ব্যক্তিগত ট্যুরে। তাঁর সময়মতো দেশ ত্যাগে যে কারো মনে প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কি ড. কামাল আগে থেকেই জানতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মতো একটি কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ড. কামালের কর্মকান্ডে এই সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী এক প্রকার জোর করেই তাকে বঙ্গবন্ধুর বেঁচে যাওয়া দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে আসেন। তখন শেখ রেহানা তাকে এই বিষয়ে অন্তত একটি বিবৃতি দিতে অনুরোধ করেন। শেখ রেহানা বলেন, যেহেতু ড. কামাল একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্টতা ছিল আর বঙ্গবন্ধুই তাঁকে মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, তাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে ড. কামাল হোসেনেরই বিবৃতি দেয়া উচিত। কিন্তু সেই সময়টাতে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে কোন বিবৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানান ড. কামাল।

ডিগবাজি নাম্বার তিন

সেনাপ্রধান লে. জে হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরপরই সারাদেশে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। এক পর্যায়ে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়ে পড়ে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ড. কামাল হোসেনও এই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেন। সে সময় এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘরে ফিরবেন না এমন বক্তৃতাও দিয়েছেন। কিন্তু আবারও ডিগবাজি খেলেন ড. কামাল। ৮৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিলে সেনাবাহিনীর হামলায় জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দীপালী সাহাসহ অনেক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার তিনদিনের মাথায় চলে গেলেন লন্ডনে। এরপর ৯০’র এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন ২৭ নভেম্বর ড. কামাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। ওই দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর হাতে নিহত হন ডা. শামসুল আলম মিলন। আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। ৪ ডিসেম্বর পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান এরশাদ। এর পরদিনই অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেন ড. কামাল।

ডিগবাজি নাম্বার চার

১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকার হরিপুর গ্যাসক্ষেত্র অক্সিডেন্টাল নামে এক বহুজাতিক কোম্পানিকে লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। দেশি গ্যাসক্ষেত্র বিদেশিদের হাতে ইজারা দেয়ার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে। ড. কামাল হোসেনও বিভিন্ন সভা সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল যে কোম্পানিটিকে গ্যাসক্ষেত্রের ইজারা দেয়া হয়েছে, সেই অক্সিডেন্টাল কোম্পানির লিগাল অ্যাডভাইজর হলেন ড. কামাল হোসেন। এটি ছিল ড. কামালের চতুর্থ ডিগবাজি।

ডিগবাজি নাম্বার পাঁচ

১৯৮৬ সালে বাংলাদেশে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বৈরশাসক এরশাদের সময় অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচন নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনে অংশ নিতে চাননি। কিন্তু ড. কামাল হোসেন তাকে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। ড. কামাল বলেন, এই নির্বাচনে না গেলে কোন দিনও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না। শত অনুরোধ পীড়াপীড়ির পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভোটগ্রহণের দিন হঠাৎ করেই মধ্যরাতে ফল ঘোষণা করা হয় নির্বাচনের, বিজয়ী ঘোষণা করা হয় জাতীয় পার্টিকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মিডিয় ক্যু করেন স্বৈরশাসক এরশাদ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে নিয়ে আসতে সবচেয়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেছিলেন ড. কামাল। কিন্তু যেই নির্বাচন শেষ হয়ে গেল, বরাবরের মতো ভোল পাল্টে ফেললেন তিনি। বলতে শুরু করলেন, আওয়ামী লীগের এই নির্বাচনে যাওয়া ঠিক হয়নি, অনেক বড় ভুল হয়েছে। এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগকে অনেক বদনাম শুনতে হয়েছে, কিন্তু এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডিগবাজিতে দক্ষ কামাল হোসেনের গায়ে একটি আঁচও লাগেনি।