বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা অনিশ্চয়তা : মনোনয়ন বাতিলের বিষয়ে সোমবার ইসির সিদ্ধান্ত আসছে

ডেক্স রিপোর্ট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর ২৫ প্রার্থীর ভোট ভাগ্য ঝুলছে নির্বাচন কমিশন ও উচ্চ আদালতে। নিবন্ধন হারানো স্বাধীনতাবিরোধী দলটির এসব প্রার্থী জোটমিত্র বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। বিষয়টি তিন কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে উচ্চ আদালতের দেয়া নির্দেশের চিঠি গত ২০ ডিসেম্বর  বৃহস্পতিবার পাওয়ার পর পরীক্ষ-নিরীক্ষা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এ নিয়ে আগামী সোমবার তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত জানার পর বিষয়টি আবারো হাইকোর্টে শুনানির জন্য উঠবে। এ অবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী-সমর্থকরা।
এর আগে জামায়াতের ২৫ প্রার্থীর নির্বাচনে অংশ নেয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিবসহ চারজনের একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। গত মঙ্গলবার দেয়া আদেশের সেই চিঠি গতকাল বৃহস্পতিবার পৌঁছে নির্বাচন কমিশনে। চিঠি পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা হাইকোর্টের চিঠিটি আজকে (গতকাল) পেয়েছি এবং আইন শাখায় বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলেছি। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কমিশনে বিষয়টি উপস্থাপন করবে। আমাদের হাতে বৃহস্পতিবারসহ আরো দুই কার্যদিবস (রবিবার ও সোমবার) আছে। এর মধ্যে কমিশন নিশ্চয়ই একটা সিদ্ধান্ত নেবে।
জামায়াতে ইসলামীর ২৫ প্রার্থীর প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটে নির্বাচন কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, জামায়াতের আমির, সেক্রেটারি জেনারেলসহ সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিবাদী করা হয়েছে। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম।
হাইকোর্টের রায়ে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি উল্লেখ করে রিটকারীদের আবেদনে বলা হয়েছে, ইদানীং বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২৫ জন প্রার্থী তাদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গৃহীত হয় এবং তাদের বৈধ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে, যা আইনগত বৈধ নয়। এ অবস্থায় জামায়াত নেতাদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা নিয়ে রুল চাওয়া হয়। এ ছাড়া রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ওই ২৫ প্রার্থীর মনোনয়ন স্থগিতও চাওয়া হয়।
২০০৮ সালের ১ আগস্ট তরিকত ফেডারেশনের দায়ের করা এক রিট মামলার রায়ে হাইকোর্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে। নিবন্ধন বাতিল হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী এ দলের নেতারা এবার তাদের জোটসঙ্গী বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। স্বতন্ত্র হিসেবেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন কয়েকজন। ওই ২৫ প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের পদক্ষেপ নেয়ার আরজি জানিয়ে আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইট থেকে তাদের রাজনৈতিক দলের ২৫ জন প্রার্থীর তথ্য-উপাত্ত এবং এ সংক্রান্তে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার রিপোর্ট দাখিল পূর্বক আপনার নিকট সবিনয়ে নিবেদন করছি, রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই ২৫ প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলপূর্বক যথাযথ পদক্ষেপ ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক।
রিট আবেদনের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর শুনানিতে বলেছেন, জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ২০০৯ সালে রিট করা হয়। ওই রিটের ওপর জারি করা রুলের চ‚ড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০১৩ সালে হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন আইনগত কর্তৃত্ব বহিভর্‚ত ও অবৈধ ঘোষণা করে। ওই রায়ে বলা হয়, রাজনৈতিক দল হিসেবে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি (১)(বি) (২) ও ৯০সি অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও সংবিধানপরিপন্থী। সেই রায় এখনো বহাল আছে। শুনানিতে তানিয়া আমীর বলেন, যেহেতু জামায়াতের নিবন্ধন নেই, তাই ওই দলের কোনো নেতা নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করতে পারছেন না।
যেহেতু নিজস্ব প্রতীকে পারছেন না, সেহেতু অন্য কোনো দলের প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। এরপরও জামায়াতের নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিয়ে ইসি হাইকোর্টের রায় ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের বিভিন্ন বিধির সঙ্গে প্রতারণা, প্রবঞ্চনা করেছে।
বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে জামায়াতের যে ২৫ জন নেতা ভোটের মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন ঢাকা-১৫ আসনে ডা. শফিকুর রহমান, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে রফিকুল ইসলাম খান, খুলনা-৬ আসনে আবুল কালাম আজাদ, কুমিল্লা-১১ আসনে সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, খুলনা-৫ আসনে মিয়া গোলাম পারোয়ার, পাবনা-৩ আনোয়ারুল ইসলাম, পাবনা-৫ আসনে ইকবাল হোসাইন, যশোর-২ আসনে আবু সাঈদ মো. শাহাদাত হোসাইন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনে আবদুল হাকিম, দিনাজপুর-১ আসনে আবু হানিফ, দিনাজপুর-৬ আসনে আনোয়ারুল ইসলাম, নীলফামারী-৩ আসনে আজিজুল ইসলাম, গাইবান্ধা-১ আসনে মাজেদুর রহমান, সাতক্ষীরা-২ আসনে মুহাদ্দিস আবদুল খালেক, সাতক্ষীরা-৪ আসনে গাজী নজরুল ইসলাম, পিরোজপুর-১ আসনে শামীম সাঈদী, নীলফামারী-২ আসনে মো. মনিরুজ্জামান, ঝিনাইদহ-৩ মতিয়ার রহমান, বাগেরহাট-৩ আসনে ওয়াদুল শেখ, বাগেরহাট-৪ আসনে আব্দুল আলীম ও চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শামসুল ইসলাম। এ ছাড়া জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ কক্সাবাজার-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। সেখানে বিএনপি অন্য কোনো প্রার্থী দেয়নি। জামায়াতের নূরুল ইসলাম বুলবুল চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, জহিরুল ইসলাম চট্টগ্রাম-১৬ এবং ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান পাবনা-১ আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করছেন।