শাহজালাল বিমানবন্দরে অব্যবস্থা

ডঃ শোয়েব সাঈদ, মন্ট্রিয়ল : এই একটি টপিক নিয়ে সম্ভবত অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে, কাজের কাজ কতটুকু হয়েছে ভুক্তভোগীরাই কেবল বলতে পারবেন। তবে বলতে দ্বিধা নেই সময়ের তালে তালে বিমান বন্দরটির কলেবর, সুযোগ সুবিধা বেড়েছে তো বটেই।

রাষ্ট্রের আর্থিক সংগতি সাপেক্ষে ১৭০ মিলিয়ন মানুষের এই দেশে আন্তর্জাতিকমানের একটি বিমানবন্দরের প্রত্যাশা খুবই সঙ্গত ছিল। তার চেয়েও বড় প্রত্যাশা ছিল আন্তর্জাতিক মানের একটি এয়ারলাইন্স থাকা। যা  আমাদের গর্বের আর সাফল্যের অনেকগুলো খাত আছে; কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, গার্মেন্টস ইত্যাদি। মর্মাহত করার মত একটি খাত হচ্ছে আন্তর্জাতিকমানের একটি এয়ারলাইন্স গড়ে তোলার ব্যর্থতা, তাও আবার যেদেশের কোটি মানুষ প্রবাসী। দুর্নীতিমুক্ত, সিন্ডিকেটমুক্ত, অপচয়বিহীন পরিবেশ রাষ্ট্রের আর্থিক সংগতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। উল্টোটি হলে রাষ্ট্রের দেবার সক্ষমতা কম্প্রোমাইজড হয়।

এই বিষয়গুলি আমরা  জানি এবং এগুলি নিয়ে বিস্তারিত কথাবার্তার খুব সুফল যে আমরা পেয়েছি তা কিন্তু নয়। অব্যবস্থাপনার বহুল আলোচিত এই বিষয়ে নয়, বরং আর্থিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়াসহজে সমাধানযোগ্য কিছু বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি। যে কোন বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার এমন অনেক দিক আছে যা একটু নজরদারী, একটু
আন্তরিকতা ,বিবেকের একটু তাড়নায় তাড়িত হয়ে ব্যাপক উন্নতি করা যায়।

গত ২৯শে ডিসেম্বর রাতে এমিরাটসে দুবাই হয়ে জুরিখে আমার ফ্লাইট ছিল। রাত ১০টার দিকে বোর্ডিং পাস নিয়ে এগুতেই সামনে দেখি ইমিগ্রেশনের প্রবেশ পথ ১। এই প্রবেশ পথে ঢুকতে চাইলে বলা হল এটি বন্ধ, বেশ ঘুরে প্রবেশপথ ২ তে যেতে বলল। প্রবেশপথ ২ তে গিয়ে দেখি লম্বা লাইন। আমার তাড়াহুড়া ছিল না, তাই দাড়িয়ে দাড়িয়ে মানুষের পেরেশানী, অব্যবস্থাপনাগুলো খেয়াল করছিলাম। বেশ কয়েকটি ফ্লাইট ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে ছেড়ে যাবে অথচ পাসপোর্ট কন্ট্রোল শেষ হয়নি অসংখ্য যাত্রীর, প্রচন্ড  চাপ সৃষ্টি হল যাত্রী আর ইমিগ্রেশন অফিসারদের জন্যে। এরই মধ্যে একজন পুলিশ অফিসার এসে পরিস্থিতি সামাল দেবার চেষ্টা করছিলেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন প্রবেশ পথ ১- এ না গিয়ে এখানে কেন এসেছি। আমি বললাম প্রবেশ পথ- ১ থেকে সবাইকে ২- তে পাঠিয়েছে। উনি বিস্মিত হলেন। উনি সবাইকে অনুরোধ করলেন যাদের হাতে সময় আছে তাঁরা যেন একটু অপেক্ষা করেন যাতে যাদের হাতে সময় নেই তাঁরা ইমিগ্রেশন প্রোসেস শেষ করতে পারে।

এরই মধ্যে উনি তাড়া আছে এমন যাত্রীদের বেছে বেছে একটা গ্রুপ তৈরি করে ফেললেন এবং তাঁদের প্রবেশ পথ ১- এ পাঠিয়ে দিলেন। উনার আন্তরিকতা আর ছুটোছুটির ফলে দ্রুত জটিল জট সমস্যার সমাধান হয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসল। আমি ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে খুব লক্ষ্য করছিলাম। পেশাদারিত্বের অভাবী আমাদের এই সমাজে,পেশাটাকে বিবেকের সাথে মিলিয়ে নিলে ফলাফলটা জাতি হিসেবে আমাদের অনেকটাই এগিয়ে দিতে পারে বৈকি। আমি লক্ষ্য করলাম যাত্রীদের টেনশনটা উনি নিজে ধারণ করলেন নিজের টেনশনরূপে। এই আচরণটি ভাল লেগেছে তাই ইমিগ্রেশন শেষে প্রোএকটিভ এই ভদ্রলোকের সাথে কথা বললাম, ধন্যবাদ দিলাম পেশাটা আন্তরিকতা দিয়ে আলোকিত  করবার জন্যে। আমি উনাকে বললাম আপনাদের প্রবেশপথ- ১ এবং ২ এর মধ্যে সমন্বয় থাকাউচিত যাতে এই ধরণের অহেতুক বিড়ম্বনা তৈরি না হয়। উনি কার্ড দিলেন, পরিচয়টি জানলাম স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইন্সপেক্টর কামরুজ্জামান বিশ্বাস। আমরা বিশ্বাস সাহেবদের কর্মদক্ষতার উপর আস্থা রাখতে চাই, আমরা চাই দায়িত্ব পালনটা যেন গাঁ চুলকানো দায়সারা গোছের না হয়ে, ভেতর থেকে আসা কমিটমেন্টের তাড়নায় তাড়িত হয়।

বিমানবন্দরে মশা আমাদের জাতীয় ইজ্জতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার পাশে বসা দুজন জাপানি পিসিতে কাজ করার চেয়ে মশা তাড়াতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। এয়ারপোর্টের মত বদ্ধ জায়গায় মশা নিয়ন্ত্রণ কি খুব জটিল? বিমানবন্দরে নির্গমন টার্মিনালের ভেতরে দরজা ঘেঁষেই স্ক্যানিং মেশিন। এখানে জটলা হয়, ফলে দরজা খুলে রাখতে হয় এবং অবাধে মশা ঢুকে।
স্ক্যানিং মেশিনটি আরো ভেতরে নিয়ে গেলে স্পেস তৈরি হত যা যাত্রীদের লাগেজ স্ক্যানিং দেওয়াসহ বিচরণে সুবিধে হত। দরজার মুখেই স্ক্যানিং মেশিন থাকার ফলে, ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের লম্বা লাইন হয় নির্গমন টার্মিনাল ভবনের বাইরের করিডোরে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের নিশ্চয় অন্যান্য দেশের বিমানবন্দর পরিদর্শনে, নানাবিধ প্রশিক্ষণে বিদেশ যাবার সুযোগ ঘটে। উনারা কি কখনো এমন কোন প্রধান বিমানবন্দর দেখেছেন,যেখানে মূল ভবনে ঢুকতেই গেটে জটলা বা লম্বা লাইন? বিমানবন্দরতো রাষ্ট্রটাকে তুলে ধরে বিদেশীদের কাছে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর মত লাইন ধরে যাত্রীদের বিমানবন্দরে প্রবেশের দৃশ্যটি ভীষণ রকমের অশোভন।লাইন থাকবে ভবনের ভেতরে, বাইরে নয়।

বোর্ডিং পাস দেবার লবিতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা। ট্রলিগুলো যত্রতত্র পড়ে থাকে। শৃঙ্খলা মানা বা অন্যের সুবিধে-সুবিধে নিয়ে ভাববার বিষয়ে শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান গৌরবের নয়। এই বাস্তবতা মানার পরেও এটা বলা যায় অন্তর দিয়ে নজরধারী করলে, বা অধস্থনরা যার যার দায়িত্ব ঠিকমত পালন করছে কিনা বিবেকের তাড়নায় একটু দেখভাল করলে সীমিত লজিস্টিকের মাঝেও বেশ ভাল থাকা যায়। বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা মন্ত্রণালয়ের উচিত ন্যুনতম উপসচিব পদমর্যাদায় কর্মকর্তা দিয়ে প্রতিদিনই বিমানবন্দরের যাত্রী সেবা এলাকায় গোপনীয়ভাবে অনির্ধারিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা, গাফলতিসহ অব্যবস্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া।

বিমানবন্দরের ভিতরে আরোহণের আগে সিকিউরিটি জোন সংলগ্ন লবিটি বেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, দেখতে ভাল লাগে। এখানে যারা পরিছন্নকর্মী হিসেবে কাজ করেন তাঁদের আরো পেশাদার মনোভাবাপন্ন হতে সাহায্য করাউচিত। টয়লেটের ভেতরে এবং দরজার পরিছন্নকর্মীদের জটলা দৃষ্টিকটু। টয়লেট ব্যবহারকারীরা ব্যবহার করবেন, পরিচ্ছন্নকর্মীরা রুটিন অনুসারে পরিস্কার রাখবেন। ব্যবহারকারীদের গাঁয়ে পড়ে খাতির করা, টিস্যু পেপার এগিয়ে দেওয়ার মত আচরণগুলো বিব্রতকর। আমাদের সংস্কৃতিতে বকশিশ কালচারের বিষয়টি আমরা বুঝলেও, বিদেশীদের কাছে ওয়াশরুমে বা টয়লেটে এই আচরণগুলো বিব্রতকর। নব্বই দশকে এশিয়ার অনেক বিমানবন্দরের টয়েলেটে এই উৎপাত ছিল, এখন আর নেই। একজন বিদেশী হিসেবে নব্বই দশকে ম্যানিলা বিমানবন্দরে টয়লেটে বকশিশ কালচারটি আমাকে ফিলিপাইন সম্পর্কে ভাল ধারণা দেয়নি। পরবর্তী দুদশকে বেশ কয়েকবার ম্যানিলায় গিয়েছি, সুযোগ-সুবিধায় আর স্টাফদের আচরণে বিমানবন্দরটির ধারাবাহিক উন্নতি চোখ এড়িয়ে যায়নি।