নিউজ ডেক্স : ক্যাসিনো সম্রাট কোনো ভিআইপি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা কর্মীদের থোরাইকেয়ার করে ব্যবহার করতেন ভিআইপি লাউঞ্জ। গত ১০ মাসে কমপক্ষে তিনি ২০ বার ভিআইপি লাউন্ঞ ব্যবহার করেছেন। বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থার নাকেরডগায় সম্রাট ভিআইপি লাউন্ঞ ব্যবহার করলেও তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি, অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। নিরাপত্তা কর্মীদের হুমকি-ধামকি দিয়ে বড় কর্তাদের খুশি সম্রাট বিমানবন্দরে ভিআইপ লাউন্ঞ ব্যবহার করতেন বলে জানা গেছে। গত জুন মাসে সিএএবির একজন নিরাত্তকর্মী সম্রাটকে ভিআইপ লাউন্ঞে প্রবেশে বাধা দিলে তাকে লান্ঞিত করা হয়। এ ব্যাপারে সিএএবির নিরাপত্তা বিভাগে লুজনোট হয়েছে। সিএএবির ভিডিও ফুটেজে তার (সম্রাট) ভিআইপি লাউন্ঞ ব্যবহারের চিত্র ফুটে ওঠলেও সিএএবি কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি।
বিমানবন্দরের দিব্যি ‘ভিআইপি’ বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ক্যাসিনোর নেশায় প্রতি মাসে কোটি টাকা নিয়ে সিঙ্গাপুর যেতেন সম্রাট। সেখানকার ম্যারিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে একমাত্র পাইজা চেয়ারম্যান কার্ড পাওয়া বাংলাদেশি সম্রাট সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টেও ছিলেন ‘ভিআইপি’। সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় সম্রাটের সঙ্গে যারা থাকতেন তারাও প্রবেশ করতেন ভিআইপি লাউঞ্জে। তাদের নিরাপত্তা তল্লাশিরও কোন বালাই ছিল না।
রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট নিজেই এমন তথ্য দিয়েছেন। বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সূত্র সম্রাটের বিদেশ যাওয়ার তথ্য সরবরাহ করেছে।
তদন্ত সূত্র জানায়, ভিআইপি লাউঞ্জের কর্মকর্তারারা তাকে লাউঞ্জে আসতে নিষেধ করলে তাদেরই তিনি ধমকাতেন। দেখে নেয়ার হুমকি দিতেন। চাকুরীচ্যুত করার কথা বলতেন। উপরের মহলের সঙ্গে মোবাইল ফোন দিয়ে লাউড স্পিকারে ওই কর্মকর্তার নাম জানাতেন। তার ওই কর্মকাণ্ডে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ত্যক্ত-বিরক্ত হলেও তাদের করার কিছু ছিল না। ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সময় তার দেহ ও ল্যাগেজ তল্লাশী করার কেউ সাহস পেতো না। সম্রাট সর্বশেষ সিঙ্গাপুরে গেছেন চলতি বছরের ২৬ আগষ্ট। সেপ্টেম্বর মাসে অভিযান শুরু হলে তিনি গ্রেপ্তার আতঙ্কে সিঙ্গাপুরে যেতে পারেননি। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৮ বার সিঙ্গাপুরে গেছেন। আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ব্যবহার করতেন।
তাকে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের দুইজন নেতা মদদ দিতেন বলে জানা গেছে। তাদের নামও জানতে পেরেছে র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল। বিষয়টি তারা তদন্ত করছেন। গত ১৫ অক্টোবর অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মামলায় ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১০ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। ওই মামলার তদন্তভার পড়েছে র্যাবের হাতে। গত ২২ অক্টোবর তার রিমান্ডের সপ্তমদিন অতিবাহিত হয়েছে।
সম্রাটের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের বিষয়টি জানতে চাইলে বিমানবন্দরের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন ও মিডিয়া) মো. আলমগীর হোসেন গণ মাধ্যমকে জানান, ‘রাষ্ট্রের ভিআইপিরাই মূলত বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন। অন্য কেউ ব্যবহার করার এখতিয়ার নেই। তিনি আরও জানান, শাহাজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ মূলত ৪ টি। সেগুলো হলো, রজনীগন্ধা, বকুল, দোলনচাপা ও চ্যামেলী। রজনীগন্ধা রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ ভিআইপিরা ব্যবহার করে থাকেন। বকুল ব্যবহার করেন এডিশানাল সেক্রেটারি পদদারি ও সমমর্যাদার ব্যক্তিরা। দোলনচাপা ব্যবহার করেন সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা। চ্যামেলী ব্যবহার করেন একুশে পদক পাওয়া ব্যক্তি, সংবাদপত্রের এডিটর ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিদেশ ভ্রমণরত বেসরকারি কর্মকর্তাগণ। এর বাইরে কারও ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের অনুমতি নেই। কেউ যদি করে থাকে তাহলে সেটি অবৈধ।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সম্রাট সর্বশেষ আগষ্ট মাসের ২৬ তারিখে সকাল সাড়ে ১১ টায় শাহজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করে রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সিঙ্গাপুরে গেছেন। ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করে গত ২৫ জুলাই রাত সাড়ে ১০টায় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে গেছেন। এছাড়াও তিনি সিঙ্গাপুরে গেছেন ২৯ জুন রাত সাড়ে ১১ টার রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে।
সূত্র জানায়, গত ২৯ মে ভোর সাড়ে ৪ টার ইউএসবাংলার একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে যান। ২৪ এপ্রিল রাত ১১ টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে যান। ২৮ মার্চ সকাল সাড়ে ১১ টায় রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে, ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ১০ টা ৩০ মিনিটে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে যান। এছাড়াও ২৯ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১ টায় সিঙ্গাপুরে এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে সিঙ্গাপুর যান সম্রাট। প্রতিবারই তিনি ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করেন। র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, সম্রাট তার দলবল নিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের চ্যামেলী ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতেন। তিনি যখন সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলতে যেতেন তখন তাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়ার জন্য তার সঙ্গে আরও দুইটি গাড়ি যেতো। সেই গাড়িতে অন্তত ১০জন যেতেন। সম্রাটের দাপটে তারা বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের পাত্তা দিতেন না। গত জুন মাসে সম্রাট সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় এক নিরাপত্তা কর্মীকে লাঞ্ছিত করেন। ওই নিরাপত্তা কর্মী তার পরিচয় জানতে চাওয়ার কারণে ওই ঘটনা ঘটে। পরে সেখানে ঊর্ধতন কর্মকর্তারা এসে বিষয়টি সমাধান করেন। সূত্র জানায়, ভিআইপি হলে বিমানবন্দরে লাগেজ তল্লাশীর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়। অনেক জনের দেহ তল্লাশী করা হয় না। সম্রাট তার লাগেজে করে ডলারসহ অন্যান্য জিনিসপত্র সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন।নিজস্ব সূত্র/ মানবজমিন
