ডেস্ক রিপোর্ট: উপমহাদেশের এক সময়কার বৃহত্তম প্রশাসনিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ ২৩৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। ১ মে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলা গঠিত হয় এবং প্রথম কালেক্টর ছিলেন মিঃ এফ. লি গ্রোস।
শুক্রবার (১ মে) এ উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ময়মনসিংহ ছিল বাংলার অন্যতম বিস্তৃত জেলা, যার অধীনে ছিল বর্তমানের একাধিক জেলা। ঔপনিবেশিক আমলে প্রশাসনিক ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এই জেলার অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভক্ত হয়ে পৃথক জেলায় রূপ নেয়। তবে আয়তন কমলেও ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বে ময়মনসিংহ আজও স্বকীয় মর্যাদায় সমুজ্জ্বল।
ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় এই জনপদের উত্তরে গারো পাহাড় ও ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে গাজীপুর জেলা, পূর্বে নেত্রকোনা জেলা ও কিশোরগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে শেরপুর জেলা, জামালপুর জেলা ও টাঙ্গাইল জেলা অবস্থিত। হাওর, নদী, বন ও পাহাড়ঘেঁষা এই ভূপ্রকৃতি ময়মনসিংহকে দিয়েছে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরিচিতি, যা এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
এই অঞ্চলের বৈচিত্র্যকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে লোকজ প্রবাদ— ‘হাওর, জঙ্গল, মইষের শিং—এ নিয়ে ময়মনসিংহ।’ এই উক্তি কেবল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়, বরং এখানকার কৃষি, মৎস্য, পশুপালন ও বনজ সম্পদের ঐতিহ্যবাহী অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও সেবা খাত।
আমাদের সময়কে অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, প্রথমেই আমি ময়মনসিংহের একজন বলে গর্ববোধ করছি। ময়মনসিংহের রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত ঐতিহ্য, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলকে আঞ্চলিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব । তবে এ জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি।
এছাড়া পরিবেশগত দিক থেকেও ময়মনসিংহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ময়মনসিংহের হাওর ও জলাভূমি রক্ষা, বনভূমি সংরক্ষণ এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ঐতিহ্যবাহী সংগীত পরিবেশনা এবং ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী। এসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে জেলার গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হচ্ছে, পাশাপাশি ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়েও হচ্ছে আলোচনা।
সরকারিভাবে ময়মনসিংহ জেলাকে শিল্প-সংস্কৃতির নগরী হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হলেও বাস্তবে এই পরিচিতি দৃশ্যমান নয়। সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে, ফলে আলাদাভাবে চেনার মতো সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে অভিযোগ সংস্কৃতি কর্মীদের।
ইতিহাস, প্রকৃতি ও সম্ভাবনার এই অনন্য সমন্বয়ে ২৩৯ বছরে ময়মনসিংহ আজ শুধু একটি জেলা নয়—এটি এক গৌরবময় পরিচয়। এক জীবন্ত ঐতিহ্য, আর ভবিষ্যতের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক বলছেন এখানকার স্থানীয় মানুষজন।
২৩৯ তম জন্মদিনে জেলা সম্পর্কে আমাদের সময়কে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রোকন উজ্জামান সরকার বলেন, ২৩৯ বছরে পদার্পণ ময়মনসিংহ জেলার। ভাবতেই চোখে জল এসে পড়ছে। এই দীর্ঘ পথচলায় ময়মনসিংহ জেলা একদিকে ইতিহাসের ধারক, অন্যদিকে সম্ভাবনার উজ্জ্বল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আমি মনে করি, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে আমাদের জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্পদকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব । এজন্য সকলকে নিজ নিজ দায়িত্বে আরও সচেতন ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এমন কাজ করতে হবে যাতে দেশবাসীর কাছে ময়মনসিংহ একটি গর্বের নাম হয়ে ওঠে।
