একুশে বার্তা রিপোর্ট : বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেওয়া ৯টি উন্নয়নমূলক ভবন নির্মাণ প্রকল্প দুই বছরেও শুরু হয়নি—এ নিয়ে রাজনৈতিক সরকারের আমলে হৈচৈ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা ক্ষতিপূরণসহ নতুন করে কাজ করার জন্য বেবিচক কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করছে। কয়েকজন প্রকৌশলীকে উকিল নোটিশ করা হয়েছে।
২০২৩-২০২৪ সাল চলে গেছে আরো প্রায় ৪ বছর আগে। এতোদিন কেন ৯টি প্রকল্পের ২শ’ কোটি টাকার কাজের হিস্যা চাওয়া হয়নি। কেন এতোদিন পরে এসে সাবেক প্রকৌশলী—যিনি একডজন মামলার আসামীদের মধ্যে একমাত্র গ্রেওফতারকৃত এবং জামিন না হয়ে জেলে অন্তরীন—তার বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ আনা হচ্ছে? ২০২৩,২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলন, পরবর্তীতে ১৮ মাসের অর্ন্তবর্তী সরকার- তখন কেন এই ৯টি ভবনের ২০০ কোটি টাকার কার্যাদেশ বুঝে নেয়া হলো না? এখন কেন রাজনৈতিক সরকারের আমলে কাজের হিস্যা চাওয়া হচ্ছে? যে চেয়ারম্যানের আমলে এই কার্যাদেশগুলো দেয়া হয়েছে তিনি দুর্নীতির ৪ মামলার আসামি। আর বেবিচক কি অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় মনে করে কার্যাদেশ হবার পরও গত ৪ বছরে কাজ করেনি, না ফান্ডের অভাব, বাজেটে টাকা নেই , না একনেকে আটকে দিয়েছে—এসব বেবিচকই ভাল বলতে পারবে। অবশ্য টেন্ডার আহবানকারি প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার থাকে –টেন্ডার বাতিল করার—এটা টেন্ডারের গায়ে সেটে দেয়া হয়ে থাকে। কাজ করার এখতিয়ার বেবিচকের না করার এখতিয়ারও বেবিচকের।
জানা যায়, প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। তবে কার্যাদেশ দেওয়ার দুবছর পরও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সব প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিকাদারদের অভিযোগ রয়েছে, কার্যাদেশের পর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান ঠিকাদারদের কাছে বড় অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। এতে রাজি না হওয়ায় তিনি তৎকালীন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেন।
এদিকে কাজ পাওয়ার পর ঠিকাদাররা ব্যাংক ঋণ নিয়ে নির্মাণসামগ্রী কিনে রাখেন। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব সামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের সুদের চাপ বাড়তে থাকায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্যরা এখনও গ্রেফতার হননি। দুদক কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত অন্যরা গ্রেফতার হবেনা বলে ধরে নেয়া যায়। যদিও বেবিচকের সাবেক দুই প্রধান প্রকৌশলী গ্যেপতার আতংকে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯টি প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করে নিয়ম মেনেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে-কুর্মিটলায় ১৪ তলা আবাসিক ভবন (ব্যয় ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, কার্যাদেশ ২৪ মে ২০২৪), কাওলায় একই ধরনের ভবন (২১ কোটি ৯৬ লাখ, ১০ জুলাই ২০২৪), সিভিল এভিয়েশন একাডেমিতে মসজিদসহ ভবন (২২ কোটি ৮৮ লাখ, ২ নভেম্বর ২০২৩) এবং তৃতীয় টার্মিনালের দক্ষিণ পাশে স্টেকহোল্ডার ভবন (২৩ কোটি ৪৬ লাখ, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)।
এ ছাড়া ক্যাব সদর দপ্তরের পূর্ব পাশে ৬ তলা ভবন (২০ কোটি ৩৭ লাখ, ১২ নভেম্বর ২০২৩), সেমসু অফিস কমপ্লেক্স (২০ কোটি ৭১ লাখ, ১৯ নভেম্বর ২০২৩), তেজগাঁওয়ে দুটি আবাসিক ভবন (২০ কোটি ৮৭ লাখ ও ২২ কোটি ৩৫ লাখ, ২৮ আগস্ট ২০২৩) এবং কুর্মিটলা আমবাগানে মসজিদসহ ভবন (২২ কোটি ৬০ লাখ, ৩ জুলাই ২০২৩) উল্লেখযোগ্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজ বন্ধ থাকার পরও ঠিকাদাররা বিভিন্নভাবে প্রকল্পগুলো চালু করার চেষ্টা চালিয়ে যান। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি তারা আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিলে বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগ বিষয়টি পর্যালোচনা করে চেয়ারম্যানের কাছে মতামত দেয়।
ওই মতামতে বলা হয়, প্রকল্পগুলো নিয়ম মেনেই অনুমোদন ও কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ শুরু না হওয়ায় ঠিকাদাররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারা আইনি পদক্ষেপ নিলে সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পগুলোর মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে দ্রুত কাজ শুরুর অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে তিনজন প্রকৌশলী এ সুপারিশে স্বাক্ষর করেন।
তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রকল্পগুলো এখনও স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার বলেন, ‘আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বহুবার চেষ্টা করেও কোনো সমাধান পাইনি। শুধু আশ্বাসে সময় কেটে যাচ্ছে। এখন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।’ তারা আরও বলেন, ‘আমরা কাজের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। ব্যাংক ঋণ নিয়ে নির্মাণসামগ্রী কিনেছি। এখন সেগুলো পড়ে আছে, আর সুদের চাপ বাড়ছে।’
এ বিষয়ে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা আলোচনা করছেন এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
