শাহজালাল বিমানবন্দর: ক্যানোপিতে ‘উন্নতির লক্ষণ নেই’

ডেস্ক রিপোর্ট:ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্যানোপিতে যে বিশৃঙ্খলা, তাতে উন্নতির কোনো ‘লক্ষণ’ দেখতে না পাওয়ার কথা বলেছেন যাত্রীরা।

তাদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট তো আছেই, ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে এবং লাগেজ পেতে আগের চেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়; অসন্তোষ রয়েছে শৌচাগারের পরিবেশ নিয়েও।

তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ক্যানোপিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সম্প্রতি বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার সুফলও অল্পবিস্তর মিলেছে। কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ পেতে যাত্রীদের কাছ থেকেও সহযোগিতা চেয়েছেন কর্মকর্তারা।

গেল বুধবার বিশ্ব ব্যাংকের ‘সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট’ নুসরাত নাহিদ নিজের ফেইসবুক পোস্টে লেখেন, “যেকোনো যাত্রীর জন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। গত বছর যতবারই আমরা ভ্রমণ করেছিলাম, প্রতিটি শৌচাগার থেকেই অ্যামোনিয়ার তীব্র গন্ধ পেয়েছিলাম। এ বছর এটি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।”

এই কর্মকর্তা বলেন, “বিমানবন্দরের টার্মিনালে প্রবেশপথে অব্যবস্থাপনা, মানুষের ভিড়, সার্ভারের জটিলতা, ট্রলি সংকট, লাগেজ পেতে অযৌক্তিক বিলম্ব, সব কিছু যেন একটা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। প্রতিটি যাত্রীর জন্য এটা পুরোপুরি নির্যাতনের মতো। কোনো জবাবদিহি কিংবা উন্নতির লক্ষণ নেই।”

ওই পোস্টে মৌসুমী দাশগুপ্ত নামের একজন মন্তব্যে লিখেছেন, “দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যাবার পর সত্যিই কষ্ট হয়, বিশেষ করে বাচ্চাদের। আমাদেরকে আবার চট্টগ্রামের কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার জন্য ডমেস্টিকেও বসে বসে মশার কামড় খেতে হয়।”

কে এম মওলা বকশ নামের একজন লিখেছেন, “যখনই আমার এই বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ এয়ারপোর্টে যেতে হয়, আমার জ্বর-জ্বর লাগে, উদ্বিগ্নও বোধ হয়।”

আফিফা রায়হানা নামে একজন বলেছেন, “বিমানবন্দরই কোনো দেশের প্রতি মানুষের প্রথম ভাবমূর্তি তৈরি করে। কী আর বলব।”

ফারিয়াল আনাম নামের একজন বলেছেন, “বিমানবন্দরে মানুষের চাপ সবসময়ই আমাদের জন্য এক কঠিন অভিজ্ঞতা। এমনকি এখান থেকে গাড়ি ঠিক করে গন্তব্যে যেতেও লম্বা সময় লাগে এজন্য। অনেকদিন ধরেই এই অভিজ্ঞতা হচ্ছে।”

এন এ চৌধুরী নামের একজন বলেছেন, “একজন জ্যেষ্ঠ পরিবহন কর্মকর্তা যখন একটা বিমানবন্দর নিয়ে এভাবে পোস্ট করেন, তখন সেটাকে আর শুধু সমালোচনা হিসাবে দেখলে চলে না। পুরো বিষয়টাকে আমলে নিয়ে সমস্যার সমাধান করা উচিত।”

গত ৩ জুলাই বাংলাদেশে ঘুরতে আসেন স্কটল্যান্ডের ভ্লগার হিউ অ্যাব্রড। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে অস্বস্তিতে পড়েন এই ভ্লগার।

ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে মানুষের জটলা দেখে ভিডিওতে অস্বস্তিতে পড়ার কথা জানান তিনি।

‘আগমনী’ গেইট ধরে বের হয়ে পাশেই থাকা এটিএম বুথে টাকা তুলতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু, আশপাশে অনেক মানুষ তাকিয়ে আছে দেখে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, “সত্যি বলতে কি, এতগুলো লোকের সামনে এতগুলো টাকা তুলতে বেশ অস্বস্তিই লাগছে৷ বিমানবন্দরে আমি এই পরিবেশ চাই না আসলে। এই পরিবেশটা মোটেই আদর্শ নয়।”

অ্যাব্রডের ভাষ্য, ভোগান্তি তখনও শেষ হয়নি। বিমানবন্দর থেকে তিনি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে যেতে চাইলে একজন চালক তার কাছে দুই হাজার টাকা ভাড়া হাঁকান! পরে অবশ্য উবারে গাড়ি ভাড়া করে বের হয়ে যান তিনি।

ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই দৃশ্য নতুন নয়। গেল ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পরপর এখানকার বিশৃঙ্খলা আরো তীব্র হয়।

বিমানবন্দরে এপিবিএন (আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন), এভসেক (এভিয়েশন সিকিউরিটি) এবং বিমানবাহিনীর মধ্যে এয়ারপোর্টে দায়িত্ব পালন নিয়ে এক ধরনের ‘অসন্তোষও’ দেখা দেয়।

যাত্রীদের অভিযোগ, ক্যানোপির ভেতরে আগমনী এবং বহির্গমন গেইটের সামনে প্রায় সবসময়ই মানুষের ভিড় লেগে থাকে।

ভিড় পাকানো মানুষজনের তালিকায় সিএনজি চালক, ভাড়ায় চালিত প্রাইভেট কার চালক, র‌্যাপিং সার্ভিস দেওয়া লোকজন, যাত্রীদের গাইড করার দায়িত্বে থাকা, ভ্রাম্যমাণ ফুল বিক্রেতা এবং যাত্রীদের ট্রলি ঠেলে দিয়ে কিছু পয়সা দাবি করা লোকজনও রয়েছেন।

 

অথচ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, যাত্রীর সঙ্গে দুজনের বেশি স্বজন বিমানবন্দরে ঢুকতে পারার কথা নয়।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিষেধ করলেও অনেক যাত্রীই সেটি মানতে নারাজ। ফলে, বাধ্য হয়েই তাদের ক্যানোপিতে ঢুকতে দিতে হচ্ছে।

বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবনের সামনে বা প্রবেশপথে যে ছাউনি থাকে, মূলত সেটাকেই ক্যানোপি বলা হয়। যাত্রী, যানবাহন ও যাত্রীদের লাগেজকে রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দিতেই এ অবকাঠামো তৈরি করা হয়।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, শাহজালাল বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী হ্যান্ডলিং ক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ। মোট ৪১টি এয়ারলাইন্স এ বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট চালায়। এর মধ্যে মাত্র চারটি দেশি, বাকিগুলো বিদেশি।

ক্যানোপিতে বিশৃঙ্খলা রোধে ২০২৪ সালে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় টার্মিনালের ডানপাশে পার্কিং এলাকার দোতলায় একটি যাত্রী বিশ্রামাগার চালু করা হয়।

সেই বিশ্রামাগার চালু থাকলেও অনেক যাত্রীই সেখানে অবস্থান না নিয়ে টার্মিনালের ক্যানোপিতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন। তাতে করে টার্মিনাল এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ক্যানোপিতে বিশৃঙ্খলা নিয়ে গেল ১৯ জুলাই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেসময় বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতির উন্নতির কথা বলা হয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে।

ইমিগ্রেশন পুলিশের একজন সহকারী উপ-পরিদর্শক বলেন, “মানুষ আসলে কথা শুনতে চায় না। এখন এখানে যারা দায়িত্বে রয়েছেন, তারা তো আর মারমুখী হতে পারেন না। মানুষ আরেকটু সচেতন হলেই পুরো জিনিসটা ‘স্মুথ’ হয়ে যেত।”

বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরে কথা হয় আবদুস সামাদ নামের একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি সপ্তাহখানেক আগে চীনে গিয়েছিলাম। আজই ফিরলাম। ক্যানোপিতে আজ দেখলাম ভিড় কিছুটা কম। তবে, এই জিনিসটা ধরে রাখা যায় না। অর্থাৎ, একমাস পরেই আবার দেখবেন যেই-সেই। এজন্য কঠোর আইন করা উচিত।”

যা বলছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ

সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ শুক্রবার দুপুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে দাবি করেন, তারা ব্যবস্থা নেওয়ায় পরিস্থিতির ‘কিছুটা উন্নতি’ হয়েছে।

সাধারণ মানুষ নির্দেশনা মানতে চান না জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যখন প্রচার করছি, লোকদেরকে বলছি, এই জিনিসটা কিন্তু খুব ইজিলি হচ্ছে না। তারা কিন্তু রিয়েক্ট করছে। আমাদের আনসারদের সঙ্গে প্রায়ই হাতাহাতি করছে তারা। এবং আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখেন, আনসার বাহিনীকে যেভাবে অনেক প্রবাসী ভাই অপমানজনক কথাবার্তা বলেন, এটা কিন্তু তাদের কাজের কর্মস্পৃহাকে অনেক কমিয়ে দেয়।”

 

তিনি বলেন, “আমাদের মিষ্টি কথা কেউ শোনে না, তারপরও বারবার অনুরোধ করা হয়। আমাদের ল্যান্ডসাইডে এপিবিএন-ও যথেষ্ট সহযোগিতা করছে, যেন ভিজিটররা ভিড় না করে।”

ট্রলির সংকট নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ট্রলি শর্টেজের কথা তো আসলে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। ট্রলি কিন্তু আসলে আমাদের যে ক্যাপাসিটিটা ছিল, সেখান থেকে ৩৮০টা ট্রলি আমরা আবার অন্যান্য বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসছি।

“এখানে এখন প্রায় ৩ হাজার ৯৮০টি ট্রলি আছে। এর ভেতরে ২০০ ট্রলির মতো মেইনটেনেন্সের জন্য আসা-যাওয়া করে, তো আমার ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজারে ৭০০ ট্রলি থাকে এখানে।”

সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “তারপরও দেখা যায়, ট্রলিটার হয় কি, আমরা যতই চেষ্টা করি, এখানেও অনেক সময় কো-অপারেশনটা পাই না আমাদের সম্মানিত যাত্রীদের কাছ থেকে। কারণ, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্রলিগুলোকে বাইরে নিয়ে যেতে চান। পার্কিং বা অন্যান্য জায়গায়, যেহেতু সেন্ট্রাল কোনো ড্রপ-অফ জোন নাই, যে যেখানে পারছেন রেখে দিচ্ছেন।

“এর ফলে কী হচ্ছে, ওই ট্রলি কিন্তু মিসিং হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আপনি একটু দেখেন, যদি স্টেশনে ঘুরে দেখেন, ওইখানে হয়তো একটা দুইটা ট্রলি পেয়ে যেতে পারেন আমাদের। তো এখন এগুলো তো ওখানে যাওয়ার কথা না। আমাদের তো আসলে অনেক জায়গাতেই সচেতনতার অভাব আছে।”