ডেস্ক রিপোর্ট: মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে দেশ ছেড়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। এরপর পেরিয়ে গেছে তিন যুগেরও বেশি সময়।
পাকিস্তান থেকে তুরস্ক, এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে ঘুরতে হারিয়ে যায় তার শৈশব। এক পর্যায়ে দুই পাও হারান তিনি।
আর হারিয়ে যায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের শেষ সুতোটুকুও।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অবশেষে দেশে ফিরেছেন ফরিদ।
কিন্তু নিজের দেশে ফিরেও সামনে ছিল আরেক কঠিন প্রশ্ন- কোথায় তার পরিবার?
ফরিদের কাছে ছিল না ঠিকানা, ছিল না কোনো ফোন নম্বর। বাংলায়ও ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না।
শুধু নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম আর কয়েকটি বিচ্ছিন্ন স্মৃতি আঁকড়ে ছিলেন তিনি। সেই সামান্য তথ্য নিয়েই পরিবারের খোঁজে নামে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। দিনভর অনুসন্ধানের পর দেশে ফেরার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে মিলেছে তার পরিবারের সন্ধান।
এখন অপেক্ষা শুধু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার। এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছরের বিচ্ছেদ পেরিয়ে স্বজনদের কাছে ফিরবেন ফরিদ।
ফরিদ জানান, প্রায় ২৫ বছর আগে নয়, তার স্মৃতিতে প্রায় ৩৫ বছর আগে- যখন তার বয়স আনুমানিক ১০ বছর। বাবা মো. আয়ুব আলীর সঙ্গে জাহাজে করে পাকিস্তানে যান। সেখানে প্রায় ১০ বছর থাকার পর দালালদের মাধ্যমে সড়কপথে তাকে তুরস্কে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপরই পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় ঠিকানা, হারিয়ে যায় পরিচিত মানুষ আর শৈশবের স্মৃতির অনেকটাই। দীর্ঘ সময় পর নিজের দেশেও ফেরার সুযোগ হয়নি তার।
এর মধ্যে জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তার দুই পা কাটা পড়ে। তবু বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে গেছেন। আর মনের এক কোণে হয়তো থেকে গেছে সেই পুরোনো বাড়ি, মা-বাবা, ভাইবোন আর ফেলে আসা শৈশবের স্মৃতি।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ভোর সোয়া ৫টার দিকে তুরস্ক থেকে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকে-৭১২ ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ।
দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে তিনি ভালোভাবে বাংলায় কথা বলতে পারছিলেন না। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতে পারছিলেন শুধু নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য।
বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে তাকে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় পরিবারের সন্ধান।
ফরিদের কাছে থাকা সামান্য তথ্যই হয়ে ওঠে অনুসন্ধানের মূল সূত্র। সকাল থেকেই ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা পরিবারের সন্ধানে কাজ শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কক্সবাজারের সহকর্মীরা যোগাযোগ করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে। বিভিন্ন এলাকায় পোস্টারও লাগানো হয়।
অবশেষে বিকেলে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত খবর- কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে।
ফরিদ আমাদের বড় ছেলে
ব্র্যাকের কক্সবাজার মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় নাছির পাড়ায় গিয়ে ফরিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ফরিদের বাবা মো. আয়ুব আলী বর্তমানে পাকিস্তানে রয়েছেন। তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। ফরিদ তাদের বড় ছেলে।
দালালের মাধ্যমে তুরস্কে যাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে ফরিদের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। বছরের পর বছর তারা জানতেন না, তাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলে কোথায়, কেমন আছেন কিংবা আদৌ বেঁচে আছেন কি না।
এত বছর পর হঠাৎ সেই হারিয়ে যাওয়া সন্তানের খবর যেন পরিবারের কাছেও অবিশ্বাস্য এক সংবাদ।
ফরিদের ভাইয়ের নাম ছৈয়দ আলম। তাকে দ্রুত ঢাকায় এনে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরপর ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ফরিদকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তার পরিবারের সন্ধান করা।
তিনি বলেন, ‘ফরিদের কাছে খুব সীমিত তথ্য ছিল। বাংলাতেও তিনি ভালোভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। আমরা সকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দিই। একইসঙ্গে কক্সবাজারের আমাদের সহকর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার লাগানো হয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিকেলেই তার পরিবারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাই। পরে তার বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।’
শরিফুল হাসান বলেন, ‘৩৫ বছর পর একজন মা তার সন্তানকে ফিরে পাবেন, একজন ভাই তার ভাইকে ফিরে পাবেন, এর চেয়ে মানবিক পাওনা আর কী হতে পারে! আমরা খুব দ্রুত ফরিদের ভাইকে ঢাকায় এনে তার সঙ্গে দেখা করিয়ে তাকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। একজন মানুষকে তার স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফরিদের পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পেছনে কক্সবাজারের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী ও ব্র্যাকের সহকর্মীদের সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে ব্র্যাকের কক্সবাজার মাইগ্রেশন টিমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।’
দীর্ঘ অপেক্ষার শেষ প্রান্তে ফরিদ
একজন মানুষের জীবনে ৩৫ বছর কম সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে পৃথিবী, বদলে গেছে মানুষের জীবন। কিন্তু বদলায়নি পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
শৈশবে বাবার হাত ধরে যে ছেলে অচেনা দেশে পাড়ি জমিয়েছিল, আজ সেই ফরিদ ফিরে এসেছেন নিজের দেশে। শরীরের দুই পা হারালেও ফিরে পেয়েছেন সবচেয়ে বড় আশ্রয়, নিজের পরিবারের সন্ধান।
এখন শুধু ভাই ছৈয়দ আলমের সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষা। সেই দেখা হয়তো মুছে দিতে পারবে না হারিয়ে যাওয়া ৩৫ বছর, ফিরিয়ে দিতে পারবে না শৈশবের দিনগুলো। তবে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর প্রিয়জনের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মুহূর্তটি ফরিদের জীবনে হয়ে উঠতে পারে নতুন করে বেঁচে ওঠার গল্প।
প্রসঙ্গত, ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম দেশে ফিরে আসা বিপদাপন্ন ও অসহায় অভিবাসীদের বিমানবন্দর থেকে সহায়তা, কাউন্সেলিং, পরিবার শনাক্তকরণ ও পুনর্মিলনসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে।
