ডেস্ক রিপোর্ট: ইতালির রোমে টরন্টো-ঢাকা রুটের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বিজি-৩০৬ জরুরি অবতরণের পর যাত্রীদের চরম ভোগান্তির ঘটনায় জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বোসরা ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার তীব্রতা সঠিকভাবে গণমাধ্যমে তুলে ধরতে না পারার বিষয়টি সামনে এনে জনসংযোগ বিভাগের প্রধানের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয় বিমান কর্তৃপক্ষ।
তবে রোমে বিমানের জরুরি অবতরণের পর বাংলাদেশি ১৭০-১৮০ জন যাত্রীকে প্রায় তিন দিন যে অমানবিক জীবন যাপন করতে হয়েছে, তার জন্য বিমান কর্তৃপক্ষের আরও অনেকেরই দায়িত্বে অবহেলা ছিল বলে মনে করছেন ওই বিমানের যাত্রীরা। একাধিক যাত্রী বাংলানিউজকে তাদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের অত্যন্ত পরিচিত লিগ্যাল ইকোনমিস্ট এমএস সিদ্দিকীর মেয়ে ওই ফ্লাইটে ছিলেন। এমএস সিদ্দিকী বৃহস্পতিবার সকালে বাংলানিউজকে বলেন, এই ঘটনায় জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তার চাকরি যাওয়ার আগে বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের চাকরি যাওয়ার কথা।
এখানে তারা চরম গাফিলতির পরিচয় দিয়েছে। প্রথমে তারা যেটা করেছে, তা হলো তথ্য নিয়ে লুকোচুরি।
প্রথমে বলেছে বিমানে এসি নষ্ট, পরে বলেছে সামান্য সমস্যা হয়েছে। এর পরে আবার জানিয়েছে সামান্য আগুন ধরেছিল। এভাবে তথ্যবিভ্রাটে ফেলে দেয় যাত্রীদের। এরপর বিমানের লোকজনরা কোথায় যে চলে যায়, তাদের আর দেখাই পায়নি যাত্রীরা। এভাবে এতগুলো যাত্রীকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে তারা যার যার মতো চলে যায়। প্রায় তিন দিনে তাদের খাবার দিয়েছে মাত্র দুই বেলা। সেই খাবারও ছিল খুবই নিম্নমানের। এ কারণে আমার মেয়ে আলাদাভাবে খাবার কিনে খেতে বাধ্য হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিমানের ক্যাপ্টেনেরও এখানে দায়িত্বে অবহেলা ছিল। রিফুয়েলিংয়ের জন্য রোমে বিমান থামানোর সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। রোমের মতো দেশে যেখানে টুরিস্টদের এক দিনের অন-অ্যারাইভাল ভিসা দেয় না, সেখানে বিমান থামানোর কারণেই এই মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে যাত্রীদের জীবনে। এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো যাত্রীর হার্টঅ্যাটাক হতো, তাহলে কোনো হাসপাতালেও তাকে নেওয়া সম্ভব হতো না।
এত ঘটনার পর গত রোববার বাংলাদেশে এসে পৌঁছায় ওই ফ্লাইটের যাত্রীরা।
বিমানের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ফ্লাইট বিজি-৩০৬ রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের পর জনসংযোগ বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। সেখানে ঘটনার প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরা হয়নি এবং যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়টি আড়াল করে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর বুধবার (১২ আগস্ট) বোসরা ইসলামকে জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে তাকে মহাব্যবস্থাপকের দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তার জায়গায় অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন বিমানের করপোরেট প্ল্যানিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মহিউদ্দিন। তার নেতৃত্বে রোমের ঘটনার তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফ্লাইটটি কেন জরুরি অবতরণ করেছিল, এরপর যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে থাকতে হলো কেন, যাত্রীদের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং সংকটের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে রোমের ঘটনার কারণ ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে। তদন্তে কারও গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
৪০ ঘণ্টা বিমানবন্দরে বাংলাদেশি যাত্রীরা
টরন্টো থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইট বিজি-৩০৬ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতালির রোমের ফিউমিচিনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। এরপর সেখানে আটকা পড়েন ফ্লাইটটির বাংলাদেশি যাত্রীরা।
ভিসা জটিলতার কারণে প্রায় ১৭০ বাংলাদেশি যাত্রীকে প্রায় ৪০ ঘণ্টা বিমানবন্দরের লাউঞ্জে অবস্থান করতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেককে লাউঞ্জের মেঝেতে রাত কাটাতে হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাসপোর্টধারী যাত্রীদের হোটেলে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে আটকে থাকায় বাংলাদেশি যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। খাবার, বিশ্রাম ও দেশে ফেরার বিষয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তাদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
পরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দল রোমে পাঠানো হয়। তারা বিমানটির ত্রুটি মেরামতের কাজ করেন। মেরামত শেষে স্থানীয় সময় শনিবার রাতে রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করে ফ্লাইটটি। রোববার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এটি ঢাকায় অবতরণ করে।
বিমানটি ঢাকায় পৌঁছানোর পর ক্ষুব্ধ যাত্রীরা তাদের ভোগান্তির বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেন। অনেকে গণমাধ্যমের কাছে তাদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। এ সময় বিমান কর্তৃপক্ষকে যাত্রীদের তোপের মুখেও পড়তে হয়।
তদন্তে নজর সংশ্লিষ্টদের ভূমিকায়
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্তে শুধু জনসংযোগ বিভাগের ভূমিকা নয়, ফ্লাইট পরিচালনা, যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও সংকট মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্বও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে জরুরি অবতরণের পর যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তাদের দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে থাকতে হলো কেন, যাত্রীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হয়েছিল কি না এবং গণমাধ্যমকে ঘটনার বিষয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ক্রু সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একাধিক সূত্রও বোসরা ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার সোহেল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাকে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। বোসরা ইসলামের মুঠোফোনেও গত তিন দিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, রোমের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। তদন্ত শেষ হওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
রোমে একটি ফ্লাইটের জরুরি অবতরণের পর যাত্রীদের দীর্ঘ ভোগান্তির ঘটনায় এখন বিমানের ব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবা এবং সংকটের সময় তথ্য দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনার দায় ও গাফিলতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
