একুশে বার্তা ডেক্স : ১৫ মে খুলনায় দেশবাসী প্রত্যক্ষ করল নতুন মডেলের ভোট ডাকাতি। বিতর্কিত সেই নির্বাচনকে নিয়ে দেশে বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে। নিয়ম অনুযায়ীই প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশনাররা নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানালেও এ নির্বাচনের পর এখনও মুখ খোলেননি তারা। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা শুরু থেকেই ছিল রহস্যজনক। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর থকে শুরু হয় বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার। প্রচারণায় অংশ নিলে নানাভাবে বাধা দেয়া হয় বিএনপি নেতাকর্মীদের। : এমনকি বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীর প্রচারণায় সশস্ত্র হামলা করে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রচারণা বন্ধ করে প্রতিবাদ জানিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বিএনপি প্রার্থী তফসিল ঘোষণার পর থেকে পরবর্তীতে প্রচারণায় বাধা, নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার, বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশি তল্লাশির নামে তান্ডব, বাড়ি ঘেরাও করে গ্রেফতার- আতঙ্ক সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগ করা হয় নির্বাচন কমিশনে। এমনকি খুলনার পুলিশ কমিশনারের প্রত্যাহার দাবি করে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু ইসি বরাবরই থেকেছে নির্বিকার। বিএনপি নেতারা এও বলেছেন, খুলনার পুলিশ কমিশনারসহ পুলিশই খুলনা সিটিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রধান বাধা। সে জন্য তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও ভীতিমুক্ত নির্বাচনি পরিবেশ তৈরির জন্য সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার জবাব এসেছেÑ বিএনপির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি অথবা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কমিশন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, স্থানীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন হবে না। পুলিশ কমিশনার প্রত্যাহারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়াবাড়িকে তারা আমলেই নেননি। বিএনপি নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার, বাড়ি বাড়ি গিয়ে হামলা ও তল্লাশি করা, আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে বরাবরই ইসি নির্বিকার ভূমিকা পালন করেছে। বিএনপির প্রার্থীর অভিযোগের বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, খুলনায় সন্ত্রাসীদের ধরা হচ্ছে। কোনো নিরীহ লোককে আটক বা গ্রেফতার করা হচ্ছে না। সরকারি এমন মন্তব্যের পর স্থানীয় পুলিশ আরো বেপরোয়া হবে এটাই তো স্বাভাবিক, হয়েছেও তাই। : একটা সময় মনে হয়েছে খুলনা সিটি নির্বাচনটা হচ্ছে পুলিশ বনাম বিএনপি। আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি নয়। নির্বাচনের কয়েকদিন আগে সরেজমিনে খুলনা সিটি নির্বাচন কিছুটা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। খুলনা নগরীর ২২ ও ২৪নং ওয়ার্ডে একদিন সারাদিন ঘুরে সেটি দেখতে পাই বিএনপি নেতাকর্মীরা দলে দলে ঘুরে ভোট চাচ্ছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ কিছুদূর পরপর নির্বাচনি ক্যাম্প করে বসে আছেন, চা খাচ্ছেন, খোশগল্প করছেন। : তাদের ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভোট চাইতে দেখা যায়নি। শুধু কাস্টম গেট এলাকায় কয়েকজন যুবককে নৌকা মার্কার ক্যাপ পরে রাস্তায় ঘুরাঘুরি করছে এমনটাই চোখে পড়েছে। সন্ধ্যার দিকে শহরের নিরালা আবাসিক এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কিছুটা তৎপরতা দেখা গেছে। সে সময় পুলিশ রাতভর এলাকায় এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িতে। কেমন ভোট হবে সে মেসেজটি পরিষ্কার ছিল সেখানেই। খুলনার বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক প্রচারণায় অংশ নিলেও প্রতিটি পয়েন্টে পয়েন্টে আওয়ামী লীগ নেতারা ক্যাম্প করে অবস্থান নিয়ে থাকেন। তাদের তো ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশই বাকি কাজ করে দিচ্ছে। গণগ্রেফতার ঠেকাতে বিএনপি প্রার্থীকে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। বিএনপির আবেদনে হাইকোর্ট নির্বাচনের একদিন আগে আদেশ দিলেন খুলনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আটক করা যাবে না। এদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে অভিযোগ করেছিল, খুলনায় লেভেল পেয়িং ফিল্ড নেই। সেখানে রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলী এক সময় ছাত্রদল করতেন, তাকে দিয়ে খুলনায় অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন নয়। সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন কমিশন আইন লঙ্ঘন করে রিটার্নিং অফিসারের উপরে সেখানে যুগ্ম সচিবের পদমর্যাদায় একজনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। বিএনপি বারবার চেষ্টা করেও নির্বাচন কমিশনে শত শত অভিযোগ করলেও কোনো কাজে আসেনি। আর আ’লীগ দাবি করামাত্র আইন লঙ্ঘন করে সেখানে যুগ্ম সচিব নিয়োগ দিয়েছিল ইসি। সেখানেই বুঝা যাচ্ছিল নির্বাচনটা কেমন হবে। : শেষ পর্যন্ত হলোটাও তাই। ভোট ডাকাতির সকল আয়োজন শেষ করে অনুষ্ঠিত হলো খুলনা সিটি নির্বাচন। : নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার সব ব্যবস্থাই ছিল পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ম্যাজিস্ট্রেট টহল। কিন্তু ভোটের আগের দিন থেকে রামদা নিয়ে মহল্লায় মহল্লায় বেরিয়ে পড়ে আওয়ামী লীগের মাস্তানরা। তারা বাড়ি বাড়ি হামলা করে এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের সৃষ্টি করে। আতঙ্কিত পরিবেশে ভোটের শুরুতে ৪০ জন বিএনপি এজেন্টকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ভোট শুরু হলে অনেক কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া হয়। ভোটের দিন সকাল থেকে সরকারি সকল নির্বাচনি আয়োজনের মধ্যেই তারা বিএনপির এজেন্ট বের করে দেয়, ভোটারদের প্রকাশ্যে ভোট মারতে বাধ্য করে, দলবেঁধে কেন্দ্রের বুথে ঢুকে ব্যালটে সিল মারে, লাইন থেকে বেছে বেছে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেয়, কোনো কোনো কেন্দ্রে দুপুরের আগেই ব্যালট শেষ হয়ে যায়, এমনকি বাবার সঙ্গে ভোট দিতে সক্ষম হয় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রও। আবার ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাক বা না যাক কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোট পড়তে দেখা গেছে শতকরা ৯৯ ভাগ। বেশির ভাগ ভোট কেন্দ্রে মেয়র ও কমিশনারদের ভোটের হিসাবের গরমিল দেখা যায়। অনেক সেন্টারে পুলিশের সহায়তায় চলে সিল মারার উৎসব। দলবেঁধে লাইন ধরে ২০-২৫ মিনিটের মধ্যে ভোট কাটার ঘটনা ঘটেছে। বিএনপির প্রার্থীর নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেছেন ১৫০টি ভোট কেন্দ্র দখল করে সিল মেরেছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। খুলনাবাসী এমন জঘন্যতম নির্বাচন আর কখনো দেখেনি। প্রকাশ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা না বাড়িয়ে সুকৌশলে সিল মারার কাজ হলে যে কোনো বড় নির্বাচনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কিংবা কমিশনাররা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কিন্তু খুলনা সিটি নির্বাচনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কিংবা কমিশনাররা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হননি। বরং নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলাল উদ্দিন আহমদ ভোট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, খুলনায় ‘চমৎকার’ ভোট হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ কমিশনাররা নিশ্চুপ থাকলেও তারা একটি নতুন মডেলের ভোট ডাকাতির নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছেন। যে ভোটের দৃশ্যত কেন্দ্রের বাইরের চেহারা ছিল শান্ত। কিন্তু ভেতরে ব্যাপক কারচুপি ও সিল মারার উৎসব চলে। বাইরে সুনসান। ভিতরে কারসাজি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনাররা কি পারবেন গণমাধ্যমে ভোট জালিয়াতির যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, ব্যালটে নৌকা মার্কায় পাইকারি ছাপ্পা মারার যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছে তা অস্বীকার করতে? : এরই মধ্যে খুলনার নির্বাচনে বল প্রয়োগ ও কারচুপির তদন্ত জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট। গণমাধ্যমেও চলছে সমালোচনার ঝড়। বিএনপি মহাসচিব পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, যে কমিশন একটি স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ তাদের দিয়ে জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী খুলনা সিটি নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সিইসির পদত্যাগ দাবি করেছেন। দিনকাল
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
