নিউজ ডেক্স : দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্রমেই স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের একটি করিডরে পরিণত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কাস্টমসের অভিযানে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দের পরিসংখ্যান যেমন বড় অর্জনের ইঙ্গিত দেয়, তেমনি একই সময়ে জব্দের পরিমাণে ধারাবাহিক পতন নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ধরা পড়া স্বর্ণই মোট পাচারের একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। ফলে ফাঁক গলে কত স্বর্ণ বাইরে চলে যাচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ঢাকার কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ৬৯৭.৬৬৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়, যার বিপরীতে আহরিত শুল্ক ও করের পরিমাণ ছিল ৫৫৭.৩৯ কোটি টাকা। পরের বছর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জব্দের পরিমাণ কিছুটা কমে ৫৫৪.৬৪৩ কেজিতে দাঁড়ালেও শুল্ক-কর বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬১.০৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ আরও কমে ৪১৭.৪৩৫ কেজিতে নেমে আসে এবং শুল্ক-কর আদায় হয় ৬১৫.৮৩ কোটি টাকা।
সবচেয়ে বড় পতন লক্ষ করা গেছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। এ সময়ে জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৬৮.৬৮২ কেজিতে এবং শুল্ক-কর আদায় হয় ৯৮.৪৩ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ মাত্র ৪৩.৫১১ কেজি এবং শুল্ক-কর আদায় হয়েছে ৬.১৪ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধারাবাহিক হ্রাসের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। একদিকে চোরাচালানকারীরা তাদের কৌশল আরও আধুনিক ও গোপনীয় করে তুলছে, অন্যদিকে নজরদারির ফাঁকফোকরও কাজে লাগানো হচ্ছে। বিশেষ করে ট্রানজিট যাত্রী, কূটনৈতিক ব্যাগেজ এবং বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা কিছু অসাধু চক্রের সহায়তায় স্বর্ণ পাচারের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, যাত্রীদের শরীরে, লাগেজের গোপন অংশে, এমনকি ইলেকট্রনিক পণ্যের ভেতরে বিশেষভাবে লুকিয়ে স্বর্ণ আনার চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও নতুন নয়। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও চক্রগুলো বারবার নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে নয়, বরং একটি সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে এই চোরাচালান চক্র দমন করতে হবে। তা না হলে দেশের প্রধান বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ পাচার অব্যাহত থাকবে এবং অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই বাড়বে।
বিমানবন্দরে জব্দ সাড়ে ১৭ কেজি সোনা, আদালতে এসে হয়ে গেল দেড় কেজি! :
সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জব্দ সাড়ে ১৭ কেজি স্বর্ণ হাইকোর্টে দেখানো হয়েছে মাত্র দেড় কেজি। বিষয়টি উঠে এসেছে চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের অনুসন্ধানে।সব শুনে তখন অভিযুক্তদের জামিন দেন হাইকোর্ট। এর পাঁচ দিন পর জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের নথি তল্লাশি করে দেখে ১৭ থেকে ৭ সংখ্যাটি সুকৌশলে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনার জানাজানি হলে স্থগিত করা হয় জামিন।গত বছরের ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে জামিন নিতে আসেন আসামিরা। সেখানেই ১৭ কেজি ৫০০ গ্রাম স্বর্ণকে দেখানো হয় মাত্র ১ কেজি ৫০০ গ্রাম।
ততক্ষণে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান আসামিরা। জালিয়াতির এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তখনই মামলার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জব্দ হয়েছিল সাড়ে ১৭ কেজি স্বর্ণ। শারজাহ থেকে আসা দুই যাত্রীর কাছ থেকে ১২০টি স্বর্ণের বার ও ৪টি স্বর্ণের পেস্টের চাকা জব্দ করেন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
যার তৎকালীন আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২১ কোটি টাকা।
অভিযুক্তদের আইনজীবী সাদিয়া ইয়াসমিন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, মামলা গ্রহণের সময় নথিপত্রে স্বর্ণের পরিমাণ এক কেজি ৫০০ গ্রাম ছিল।
