জাতিসংঘ ৭৩তম অধিবেশনে মহাসচিব গুতেরেস : বিশৃঙ্খল পথে এগোচ্ছে বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেক্স : জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ক্রমান্বয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ছে। বিশৃঙ্খল পথে এগোচ্ছে বিশ্ব। বিশ্বাস ভাঙনের এক ভয়াবহ ব্যাধিতে আক্রান্ত পুরো বিশ্ব।

ক্ষমতার ভারসাম্য বদল যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’  ২৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে সভাপতিত্বের ভাষণে এ কথা বলেন তিনি। অধিবেশনে সাধারণ বিতর্কের প্রথম দিনেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়েছেন। খবর বিবিসি ও এএফপির।

মঙ্গলবার থেকে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের নেতাদের উপস্থিতিতে সাধারণ বিতর্ক শুরু হয়েছে। চলবে ১ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রথম দিন ৩৬ রাষ্ট্রনেতা ভাষণ দেন। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় প্রথম মঞ্চে ওঠেন গুতেরেস। তিনি বলেন, ‘নিজেদের জনগণের কল্যাণকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব নেতার। জণসাধারণ কল্যাণের অভিভাবক হিসেবে বহুপাক্ষিক জোট ব্যবস্থার সংস্কার ও উন্নয়নের দায়িত্বও আমাদের।’

‘রাজনৈতিক আগ্রাসনের’ বিষয়ে হুশিয়ারি দিয়ে গুতেরেস বলেন, ‘কিছু না থাকার পরেও যারা তাদের প্রতিবেশীদের বিপজ্জনক হিসেবে দেখছে তারা হুমকি সৃষ্টি করছে। যারা অভিবাসী নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত বন্ধ করছে তারা স্রেফ পাচারকারীদের উস্কে দিচ্ছে। যারা সন্ত্রাসবাদ দমনে মানবাধিকারকে এড়িয়ে যাচ্ছে তারা সেই চরমপন্থীদের জন্ম দিচ্ছে, যাদেরকে তারা শেষ করতে চাইছে।’

গুতেরেস তার ভাষণে কোনো বিশ্ব নেতার নাম উল্লেখ করেননি। কিন্তু তিনি যে এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রক্ষণশীল নীতি, মেক্সিকো প্রাচীর, প্যারিস চুক্তি, ইরান চুক্তিসহ আন্তর্জাতিক জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বের হয়ে যাওয়ার হুমকির সমালোচনা করেছেন তা সুস্পষ্ট।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে সতর্ক করে গুতেরেস বলেন, ‘আমরা একটি সংকটপূর্ণ মুহূর্তে পৌঁছেছি। আগামী দুই বছরে যদি আমরা আমাদের আচরণ না পাল্টাই, তবে লাগামছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলকে উদ্ধৃত করে গুতেরেস বলেন, পৃথিবী উষ্ণতর হচ্ছে, কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব বাড়ছে। বিশ্বনেতাদের সতর্ক করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে আমাদের থেকে ঢের দ্রুতগতিতে। পরিবর্তনের সেই গতি বিশ্বজুড়ে জীবনের আর্তনাদকে তীব্রতর করবে।’

অধিবেশনে বিশ্ববাসীর নজর ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দিকে। ভাষণে একে-অপরের প্রতি পাল্টাপাল্টি হুমকি ও উপহাস বিনিময় করেছেন ট্রাম্প ও রুহানি। মঙ্গলবারের ভাষণে ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন।

অপরদিকে ট্রাম্প ‘বুদ্ধির খরায়’ ভুগছেন বলে মত প্রকাশ করেছেন রুহানি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘ অধিবেশনের ভাষণকে ইরানের ‘দুর্নীতিগ্রস্ত একনায়কতন্ত্রের’ ওপর আক্রমণে, উত্তর কোরিয়ার প্রশংসা ও বিশ্বায়নের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে আমেরিকার স্বার্থ রক্ষাই যে তার লক্ষ্য তা তুলে ধরতে ব্যবহার করেন। ট্রাম্পের ৩৫ মিনিটের ভাষণের বেশিরভাগ অংশজুড়েই ছিল ইরান। তেহরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা এবং সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে নানা ধরনের সহায়তা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ‘অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির’ অভিযোগ রয়েছে ওয়াশিংটনের।

ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের নেতারা বিশৃঙ্খলা, মৃত্যু ও ধ্বংসের বীজ বপন করছেন। প্রতিবেশী, সীমানা কিংবা জাতিগুলোর সার্বভৌমত্বের অধিকার কোনো কিছুর প্রতিই শ্রদ্ধা নেই তাদের।’ ট্রাম্পের বক্তৃতার বেশিরভাগ সময়ই নীরব ছিলেন তার ‘একলা চলো’ নীতিতে অস্বচ্ছন্দ বিশ্ব নেতারা। ভাষণটিতে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’নীতিটিই খুব জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন নাগরিকদের দ্বারাই শাসিত।

আমরা বিশ্বায়নের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছি, দেশপ্রেমের মতবাদকে আলিঙ্গন করেছি।’ তবে তার বক্তব্য নিয়ে জাতিসংঘ মঞ্চে কম হাসাহাসি হয়নি। ‘দুই বছরের বেশি সময়ের তার অর্জন আগের অন্য যে কোনো প্রশাসনের চেয়ে বেশি’- ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর বিশ্বনেতারা হেসে ওঠেন।

বিশ্ব নেতাদের সামনে দেয়া ভাষণে বেপরোয়া ছিলেন ইরানি প্রেসিডেন্টও। রুহানি ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে ২০১৫ সালে তেহরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। ট্রাম্পের সঙ্গে ‘ছবি তোলার সুযোগের দরকার নেই’ বলে মন্তব্য করেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে যাওয়াকে তিনি ‘চরিত্রের দোষ’ হিসেবে অভিহিত করেন।

রুহানি বলেন, ‘বহুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা শক্তিমত্তার নিদর্শন নয়। উল্টো এটা হচ্ছে বুদ্ধির দীনতা।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরান যা বলছে, তা স্পষ্ট : যুদ্ধ নয়, নিষেধাজ্ঞা নয়, হুমকি নয়, নয় টিটকারি; কেবল আইন ও এর বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী পদক্ষেপ।’

এদিকে জাতিসংঘ অধিবেশনে সংরক্ষণশীল রাষ্ট্রীয় নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশ্বনেতারা। গুতেরেস, সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসাসহ বিশ্বনেতারা বহুপক্ষীয় পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে সরব হন। ফার্নান্দা বলেন, ‘৭৩ বছর আগে জাতিসংঘের কাজ যেমন ছিল, এখনও তেমনই আছে। আমরা বৈশ্বিকভাবে যে সমস্যার মুখোমুখি আছি তা সমাধানের জন্য জোটবদ্ধতা একমাত্র পথ।’

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ধারণাকে হেয় করার সব ধরনের প্রচেষ্টা রুখে দিতে হবে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি জরুরি।’ মালাবির প্রেসিডেন্ট আর্থার পিটার মুথারিক ঘোষণা করেন, সব রাষ্ট্রই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো সংখ্যালঘু নেই, কোনো ছোট দেশ নেই। জাতিসংঘই একমাত্র পরিচয়।’

ইরানকে নরকে পাঠানোর হুশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের : যুক্তরাষ্ট্র, এর নাগরিক কিংবা মিত্রদের ক্ষতি করলে ইরানি নেতাদের ‘নরক গুলজার’ করে ছাড়ব। ইরানের বিরুদ্ধে এমন হুশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে ইরানবিরোধী এক সম্মেলনে ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেন, ‘মিথ্যা, প্রতারণা ও শঠতা’ অব্যাহত রাখলে ‘তেহরানের মোল্লাদের খুনি শাসনব্যবস্থাকে’ গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। বোল্টন বলেন, ‘যদি তোমরা আমাদের, মিত্রদের কিংবা অংশীদারদের বেলায়ও সীমা লঙ্ঘন কর, তাহলে অবশ্যই গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের এ বার্তা স্পষ্ট। আমরা নজর রাখছি, আমরা তোমাদের ঘাড় মটকে ধরব।’