আলী মামুদ : আরেক অনিশ্চয়তার জাতীয় সংসদ একাদশ নির্বাচন আসছে। চলতি জাতীয় সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদ ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসেই শেষ হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন সংসদ নির্বাচন করা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। মেয়াদান্তে চলতি সংসদ ভেঙে যাবে। এদিকে বিগত দশম সংসদ নির্বাচনের মতো একাদশ সংসদ নির্বাচনও অংশগ্রহণমূলক হবে নাÑবলেই ব্যাপকভাবে আশক্সকা করা হচ্ছে। সুদূর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণারত একজন বাংলাদেশি অধ্যাপকের মতে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে বলে তিনি মনে করেন না। এদিকে তত্ত্বাবধাপক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা (আইন বিষয়ক) ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সম্প্রতি বলেন, একটি পার্লামেন্ট বহাল থাকাবস্থায় আরেকটি পার্লামেন্ট নির্বাচন হতে পারে না। সংসদ ভেঙেই নতুন নির্বাচন দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সরকার ও রাজনীতি’ বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতে এখন পর্যন্ত আগামী সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে বলে তিনি মনে করছেন না, তবে রাজনীতিতে একটি দিনও দীর্ঘ সময় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, বর্তমানে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল বুধবার বলেন, আমি কায়মনোবাক্যে তো আশা করি এবারের সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক কিন্তু হবে কি-না সেটেই তো সন্দেহ।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের আমলেই সংশোধিত সংবিধানের বিধিমতে ১২৩(৩) সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে : ‘(ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং : (খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে ঃ তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ উক্ত দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ বর্তমান সংবিধানের ৭২(৩) এর বিধিতে বলা আছে রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে : তবে শর্ত থাকে যে, প্রজাতন্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত থাকিবারকালে সংসদের আইন দ্বারা অনুরূপ মেয়াদ এককালে অনধিক এক বছর বর্ধিত করা যাইতে পারিবে। তবে যুদ্ধ সমাপ্ত হইলে বর্ধিত মেয়াদ কোনক্রমে ছয় মাসের অধিক হইবে না। : দেশে-বিদেশে সন্দেহ ঃ বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করার ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষ থেকেই বক্তব্য বেরিয়ে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আগামী সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবেÑ অর্থাৎ গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ (দশম) নির্বাচন যে সুষ্ঠু অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হয়নি, তা তারা প্রকারান্তরে স্বীকার করছেন। বিরোধী দলসমূহের পক্ষ থেকে তো ব্যাপক দাবিই তোলা হয়েছে আগামী সংসদ নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। এই লক্ষ্যে তারা বর্তমান জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য দাবি করে আসছে। : এদিকে গত মঙ্গলবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্য বাংলাদেশের আগামী সংসদ নির্বাচন যাতে অংশগ্রহণমূলক হয় তা নিশ্চিত করার আহবান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাংলাদেশ বিষয়ক গ্রুপের প্রধান মিস জ্যা ল্যামবার্ট সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন নির্বাচনে সহিংসতা সৃষ্টিকারী সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি দলীয় যুবগোষ্ঠীগুলোর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। মিস ল্যামবার্ট বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করার আহবানও জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নেতৃত্বে একটি টীম ঐ সভায় অংশ নেন বলে প্রকাশ। : সংসদ ভেঙেই নতুন সংসদ নির্বাচন-ব্যারিস্টার মইনুল : বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক আইন বিষয়ক উপদেষ্টা গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, একটি সংসদ বা পার্লামেন্ট বহাল থাকাবস্থায় আরেকটি সংসদ নির্বাচন কিভাবে হতে পারে? প্রতিবেশী দেশেও তো হয় না। এটা সবারই জানা। তিনি বলেন, যদি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সবাই চান, তাহলে তো, আগে সংসদ ভাঙতেই হবে। উল্লেখ্য, ব্যারিস্টার মইনুল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন সেই সরকারের অধীনে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। : আগামী নির্বাচন হোক অংশগ্রহণমূলক- ড. আলম বদিউল আলম মজুমদার : নির্বাচন পর্যবেক্ষক ড. বদিউল আলম মজুমদার গতকাল বুধবার এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমি তো কায়মনোবাক্যে চাই আগামী সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হোক। নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা আরো বাড়–ক। সব দলের অংশগ্রহণে যদি নির্বাচন হয় তাহলে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ আশা করা যায়। এজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। : রাজনীতিতে একটি দিনও দীর্ঘ সময়- অধ্যাপক আলী বীয়াজ : যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের প্রফেসর আলী রীয়াজ সম্প্রতি চ্যানেল আই-এর তৃতীয় মাত্রায় অংশ নিয়ে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচন যে অংশগ্রহণমূলক হবে এখন পর্যন্ত আমার তা মনে হচ্ছে না। তবে রাজনীতিতে একটি দিনও দীর্ঘ সময় বলে তিনি মন্তব্য করেন। : চ্যানেল আই-এর এই অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক জিল্লুর রহমান তার কাছে জানতে চান আগামী সংসদ নির্বাচন কেমন হবে। উত্তরে অধ্যাপক রীয়াজ এই মন্তব্য করেন। মৃদুভাষী অধ্যাপক রীয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থা থেকেই লেখালেখি করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় তিনি প্রায়শ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৎকালীন অধ্যাপক আলী আনোয়ারের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। তখনই লক্ষ্য করা গেছে তার মৃদু ভাষণ ও স্পষ্টচারিতা। সম্প্রতি ঢাকায় এক সাক্ষাৎকারে (ইত্তেফাক ১০.০৭.১৮) বলেন যে, আগামী সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি-না সন্দেহ। সাম্প্রতিক দুটি স্থানীয় সংসদ নির্বাচনে যা দেখলাম তারপরই এটি মনে হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশকে তিনি হাইব্রিড বেজিম (দোআঁশলা ব্যবস্থা) বলে মন্তব্য করেন- যা ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। :
