দুদকের ট্যাপ কেসে আতংকিত ঘুষখোররা: বিমান, বেবিচক, কাস্টমসেও পা বাড়াচ্ছে: হটলাইন ১০৬-এ অভিযোগ করার আহবান

নিউজ ডেক্স : দীর্ঘ প্রায় সাত মাস পর দুদকের ট্যাপ কেস সক্রিয় হয়ে ওঠেছে। এতে করে আতংকিত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন দপ্তরে সরকারি কর্মকর্তারা, তাদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। এ ট্যাপ কেস বিমান, বেবিচক, কাস্টমসে পা বাড়াবে বলে জানা যায়।
দুদক ৬ মাস কমিশনবিহীন থাকার পর নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই আবার মাঠে সক্রিয় হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফাঁদ অভিযান। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ গ্রহণের সময় হাতেনাতে আটক করতে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে সংস্থাটি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দুই লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের সময় সাব-রেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান, হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপন দাশকে হাতেনাতে আটক করেছে দুদকের একটি দল। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ফেনীতে এক লাখ টাকা ঘুষসহ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আল-সাঈদ ও কার্যসহকারী আবু নাছেরকে আটক করা হয়। একই সঙ্গে রাজউক, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতিবিরোধী এনফোর্সমেন্ট অভিযানও জোরদার করা হয়েছে।
সর্বশেষ চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের ঘটনায় দুদক জানায়, এক আইনজীবী তার মক্কেলের দুটি অংশীদারি চুক্তিপত্র নিবন্ধনের জন্য ওই কার্যালয়ে গেলে কোনো ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও দলিল নিবন্ধন আটকে রাখা হয়। পরে নিবন্ধনের বিনিময়ে তার কাছে দুই লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। বিষয়টি জানিয়ে ওই আইনজীবী প্রথমে দুদকের হটলাইন ১০৬-এ অভিযোগ করেন এবং পরে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগ যাচাই করে
প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কমিশনের অনুমোদনে ফাঁদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। নির্ধারিত দুই লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় সাব-রেজিস্ট্রার আবদুস সোবহান, হেড ক্লার্ক ফারুক ইসলাম ও উমেদার রূপন দাশকে আটক করা হয়।
এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আল-সাঈদ ও কার্যসহকারী আবু নাছেরকে এক লাখ টাকা ঘুষসহ হাতেনাতে আটক করা হয়। পাঁচটি প্রকল্পের বিল পরিশোধের বিনিময়ে পিআইও ১২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ। অভিযোগকারীর আবেদনের পর কমিশনের অনুমোদনে ফাঁদ অভিযান চালিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি তাদের আটক করে দুদকের নোয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের একটি দল।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, ফাঁদ অভিযান কোনো সাধারণ অভিযান নয়। প্রথমে ঘুষ বা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করা হয়। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে পরিকল্পিতভাবে অভিযানে যায় ট্র্যাপ টিম। ফলে ঘুষ গ্রহণের সময় অর্থসহ অভিযুক্তকে হাতেনাতে আটক করার পাশাপাশি মামলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণও সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, আমরা ট্র্যাপ কেস (ফাঁদ অভিযান) শুরু করেছি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে, অর্থাৎ অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই করে ট্র্যাপ কেস পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অভিযানের মধ্যে যারা ঘুষ লেনদেন করে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হব। তিনি বলেন, সরকারি অফিসগুলোয় দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযান শুরু হয়েছে। নানা উৎস থেকে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশনের অনুমোদনক্রমে সারাদেশে দুর্নীতিবিরোধী অপারেশন পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরেছে এবং এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। আগামীতে এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে। এ জন্য দুদকের হটলাইন ১০৬ এ অভিযোগ জানাতে ভুক্তভোগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দুদক সচিব।
দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজউক, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এর পাশাপাশি ঘুষের অভিযোগে ফাঁদ অভিযানও পুনরায় জোরদার করা হচ্ছে।
পুরনো সাফল্যের পর কমে যায় ফাঁদ অভিযান : একসময় দুদকের দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের অন্যতম দৃশ্যমান কৌশল ছিল ফাঁদ পেতে ঘুষখোরদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা। দুদকের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ২৪টি ফাঁদ মামলা হয়। পরের বছর ২০১৮ সালে ১৫টি এবং ২০১৯ সালে ১৬টি ফাঁদ মামলা পরিচালিত হয়। ২০২০ সালে ১৮টি এবং ২০২১ সালে ছয়টি ফাঁদ মামলা হয়।
অর্থাৎ ২০১৭ থেকে ২০২১- এই পাঁচ বছরে মোট ৭৯টি ফাঁদ মামলা পরিচালনা করে দুদক। এর মধ্যে ২০১৭ সালেই সর্বোচ্চ ২৪টি ফাঁদ মামলা হয়। পরবর্তী সময় এ ধরনের অভিযান ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে।
২০১৮ সালের দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনেও দেখা যায়, ওই বছর ১৫টি ফাঁদ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। একই সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের গ্রেপ্তারও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
হটলাইন ১০৬ থেকে ফাঁদ অভিযান : দুদকের ফাঁদ অভিযানের অন্যতম উৎস সাধারণ মানুষের অভিযোগ। দুর্নীতির তথ্য সরাসরি জানাতে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই ১০৬ নম্বর হটলাইন চালু করে দুদক। পরবর্তী সময়ে এ হটলাইন দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। দুদকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হটলাইনে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে এনফোর্সমেন্ট অভিযানসহ তাৎক্ষণিক বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সাম্প্রতিক পাহাড়তলী অভিযানেও সেই হটলাইন ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে।
চলতি বছরের ৩ মার্চ তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করার পর সংস্থাটি প্রায় ছয় মাস কমিশনবিহীন ছিল। পরে ১৭ আগস্ট নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান এবং কমিশনার হিসেবে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা ১৯ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ফাঁদ অভিযান ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদারের বার্তা দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে ঘুষের টাকা গ্রহণের সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
দুদক কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগ যাচাই করে ফাঁদ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও এনফোর্সমেন্ট অভিযান অব্যাহত থাকবে। গতকাল বৃহস্পতিবারও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশক নিধন কর্মসূচিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুদকের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম। এ অভিযানের বিষয়ে কর্মকর্তারা কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে। এর ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে দুদকের জনসংযোগ দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।
লক্ষ্য হচ্ছে ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা। ফলে দীর্ঘদিন পর আবার মাঠপর্যায়ে ফাঁদ অভিযানকে দুর্নীতি দমনের দৃশ্যমান কৌশল হিসেবে সামনে আনছে নতুন কমিশন।
দুদক