নিউজ ডেক্স : জনপ্রশাসনের চৌকস কর্মকর্তা সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক তার দীর্ঘ ৩৬ বছরের বর্ণাঢ্য চাকরিজীবনের ইতি টেনেছেন ৫ জানুয়ারী ২০২১ ইং । সর্বশেষ তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে এক বছরের চুক্তিতে কর্মরত ছিলেন। তার চাকরিজীবনের শেষ কর্মদিবস অবদি অপরাজিত ব্যাটসম্যানের মতো শেষদিন পর্যন্ত লড়ে গেছেন অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলে মূল্যায়ন করেছে আমাদের সময়।কিন্ত বিমানের কিছুটা হলেও সিভিল এভিয়েশনের দুর্নীতির মূল্যোৎপাটন তিনি করে যেতে পারলেন না, তার যাবার আগে খবর আসে সাবেক এক চেয়ারম্যানের দুর্নীতির। সাবেক প্রধান প্রকৌশলীকে বাধ্যতামুলক অবসরে পাঠানো, দুর্নীতির জন্য বার বার দাপ্তরিক চিঠি দেবার পরও মামলা হয়নি। উপপরিচালক (প্রশাসনের) পদটি ‘ব্লাকবল’ করে বদলি অযোগ্য করে রাখার ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সিভিল এভিয়েশনে ফাইল আটকে ঘুষ নেয়ার নিয়ম উবে নিতে পারেননি। সদস্য (অর্থের) পিএ হাফিজের দুর্নীতিরচিএ ওপেন হলেও হাফিজ একন স্বপদে-স্বস্থানে বহাল।
তার এক ভাইও নাকি ঠিকাদারি কাজ করেছেন, কোটি কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেয়া হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরে জেনারেটর ক্রয় দুর্নীতির মামলায় চার্জশীট হলেও কেউ কেউ তদবির করছেন , কেউ আবার ষড়যন্ত্রের শিকার বলে দাবি করেছেন। তবে মুহিবুল হকের আমলে দুর্নীতি কিছুটা স্মিমিত হয়ে আসে-যা আবার মাথাচারা দিতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মুহিবুল হক চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। তিনি যশোর ও ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ছিলেন। ২০১২ সালের নভেম্বরে মহিবুল হক এপিডি (যুগ্ম সচিব) হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি উইংয়ের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। পরে অতিরিক্ত সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখায় যোগ দেন। পরবর্তীকালে ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল সচিব হিসেবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন
মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন।
এ মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়েই মহিবুল হক বাংলাদেশ বিমান, সিভিল অ্যাভিয়েশন এবং পর্যটন মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার করা দুর্নীতিবাজচক্রের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। এ কাজে নেপথ্যে থেকে তাকে অদম্য সাহস জুগিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি সাফল্যের সঙ্গে লড়তে পেরেছেন। ফলে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা বিমানের পুঞ্জীভূত টিকিটিং দুর্নীতির বিষদাঁত উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়। এ ছাড়া নানা রকম কেনাকাটায় দুর্নীতি অনেকাংশে রোধ করাও সহজ হয়। এতে বিমানের সেবার মান বেড়ে যায়। লোকসানের বদনাম ঘুচিয়ে বিমান প্রথমবারের মতো লাভের মুখ দেখে।
স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অনিয়ম চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন মহিবুল হক। এ ছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকাসহ অন্যান্য সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা উন্নতকরণ, আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ করা হয় তার আমলে।
মহিবুল হকের আমলে ঢাকা বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালের অপ্রয়োজনীয় স্টল উচ্ছেদ করে যাত্রী/ ভিআইপিদের চলাচল সহজ করা হয়। বিনোদন, গবেষণাকাজ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারে ড্রোন উড্ডয়ন নিশ্চিতকরণের জন্য ড্রোন নিবন্ধন ও উড্ডয়ন নীতিমালা-২০২০ প্রণীত হয়।
আর্থিকভাবে ভেঙে পড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটিং, কার্গো হ্যান্ডলিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ইঞ্জিনিয়ারিং মেইনটেন্যান্স, জিডিএস ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অনিয়ম বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত করে অনিয়ম/ দুর্নীতিবাজচক্র চিহ্নিত করা হয়। সেই সঙ্গে দুর্নীতিতে যুক্ত সব স্তরের কর্মকর্তা/কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেডকে জবাবদিহিমূলক এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়। বিমানের লন্ডন শাখার অনিয়ম তদন্তসহ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিদেশের অন্য শাখায় যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ এবং কার্যক্রম স্বচ্ছ করা হয়। কার্গো পরিবহনের অনিয়ম/দুর্নীতি কমিয়ে বিমানের এ খাতে আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হয়। বিমানের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস সিস্টেম, ডিপারচার কন্ট্রোল সিস্টেম, গ্লোবাল ডিসট্রিবিউশন সিস্টেম, মসলিন লাউঞ্জ পরিচালনায় অনিয়ম ট্রানজিট, উডোজাহাজের যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি, প্যাসেঞ্জারদের খাওয়া এবং হোটেলে অবস্থানসংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
কিন্ত বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশনের উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি কমেনি। এখানে ঘুষ ছাড়া ফাইল নগেড়চড়ে না ।শতকরা পার্সেন্টস ছাড়া ঠিকাদারি কাজের ফাইল অচল। দুর্নীতির মামলা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এক প্রকৌশলী জেলে, ৫ জন জামিনে, থার্ড টার্মিনাল নিয়েও টেন্ডারে স্বচ্ছতার প্রশ্ন ওঠেছে, বর্তমান চেয়ারম্যান তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।একজন পিডিকে সাসপেন্ডও করা হয়, মন্ত্রণালয়ের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ডিপির দায়িত্ব দেয়া হয়।একুশ শতকের কাগজ ‘একুশে বার্তা’র অনলাইন ও অফলাইনে সিএএবি সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে সচিব নজর দিতেন, প্রশাসনিক এ্যাকশনে যেতেন, সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব, সিএএবির সদস্য প্রশাসনকে দুই দুইবার বদলি করা হয়।অবসরে যাওয়া একজন সিভিল প্রকৌশলী ২টি গাড়ি ব্যবহার করা সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় থেকে দাপ্তরিক চিঠিতে জবাব চাওয়া হয়। শাহজালালে গত হজ্ব মওসুমে পানি নিয়ে সমস্যা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। জিও ছাড়া এক নারি কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।কক্সবাজার বিমানবন্দরে ফেল্ট-এ এক যুগ্ম সচিবের কারিগরি পরিদর্শনে সরকারি খরচে বিদেশ গমন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ডিডি অডিট এক মহিলা কর্মকর্তাও এ পরিদর্শনে যান।
