বিমানের চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটে ৫ বছরে প্রায় ৫ শ’ কোটি টাকা লুটপাট : রাঘববোয়ালরা ধরাছোয়ার বাইরে : গঠিত হয়নি তদন্ত কমিটি : হিসাব তলব করে সার্কুলার জারি : ৩শ’ টিকিট জালিয়াতির তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব!

এইচএম দেলোয়ার : বাংলাদেশ বিমানের চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের গত ৫ বছরে প্রায় ৫ শ’ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত একটানা ৫ বছর এই টাকা লুটপাট করা হয়েছে। এয়ারফ্রেইট আমদানি শাখার সহকারি ব্যবস্থাপক ডিবাকর এই ৫শ’ কোটি টাকা লুটপাটের কাহিনী উৎঘাটন করার পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিমান কর্তৃপক্ষ হিসাব তলব করে এক সার্কুলার জারি করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সহকারি ম্যানেজার আমদানি শাখা ডিবাকর ৫ শ’ কোটি টাকার লুটপাটের বিষয়টি ফাইন্ডআউট করায় এবং বিমান কর্তৃপক্ষ তার হিসাব চেয়ে সার্কুলার জারি করায় এর সাথে জড়িত রাঘববোয়ালরা তাকে জীবননাশের হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ ওঠেছে। ৫শ’ কোটি টাকা লুটপাটের এক গডফাদারকে পদোন্নতি দিয়ে বিমানের বিদেশি একটি স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানজারের পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে এবং তিনি পোস্টিং নিয়ে চলে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে এখনও কোন তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি। এই ৫ শ’ কোটি টাকার লুটপাটের সাথে জড়িত বিমানের একজন জিএম বিমানের চেয়ারম্যানের ক্লাসমেট এবং এমডির বন্ধু হওয়ার সুবাধে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার পায়তারা করা হচ্ছে। এ দিকে বিমানের ক্রিকেট টিমের ফ্রি ৩শ’ টিকিট জালিয়াতির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব করে দেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রমতে ওই জিএম এবং বিমানের বর্তমান এমডি ইতিপূর্বে বিমানের ক্রিকেট টিমের ৩শ’ টিকিট জালিয়াতির সাথেও জড়িত। এ ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই গায়েব করে দেয়া হয়েছে। ওই টিকিট জালিয়াতির টাকায় বিমানের এমডি গাজিপুরে বিশাল বাগানবাড়ি করেছেন বলেও সূত্রে জানা গেছে। যা পুন: তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। এবং দুদক এ ব্যাপারে তদন্তে নামলেই রহস্য বের করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিমানের কার্গো ভিলেজের আমদানি শাখার একটি সংঘবদ্ধচক্র বিমানের চার্টাার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের কোন বিলের টাকা বিমানের অনুক’লে ইচ্ছাকৃতভাবে সরাসরি গ্রহণ না করে আদায় করে নিজেরা আত্মসাত করেছেন। এই বিলগুলো গোপনে জিএম কার্গো আমদানি/ রফতানি শাখা, বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে পরিচালক মার্কেটিং এন্ড সেলস-এ কর্মরত আলি আহসান বাবু , ইফতেখার ডিজিএম কার্গো আমদানি/ রফতানি শাখা, সহকারি ব্যবস্থাপক ও তৎকালিন আমদানি/ রফতানি শাখার এইচডিকিউ ইনচার্জ আলমগীর, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার মাহফুজ, কার্গো সুপার অসীম , শরিফুল, লোডার মাসুদ এবং বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ, আমিনুল, শরাফত- এদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হতো। এই ভাগবাটোয়ার টাকা বিমানের এমডি পর্যন্ত চলে যেতো। কিন্ত ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডিবাকর কার্গো আমদানি শাখায় সহকারি ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখতে পান যে, প্রতি চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটে প্রতিদিন কমবেশি বিমানের রাজস্ব ৪ লাখ টাকা আয়ের টাকা ২০১৩ সালের পর থেকে বিমানের ফান্ডে সংগ্রহ করে জমা করা হচ্ছে না। তখন তিনি এই বিলের ব্যাপারে বা এর উৎস নিয়ে দেনদরবার শুরু করেন। ফাইল গাটাগাটি করে দেখতে পান যে, চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের রাজস্ব বাবদ এক টাকাও বিমানের ফান্ডে জমা হয়নি। অথচ প্রতি সপ্তাহে ৩/৪টি চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইট শাহজালালে অবতরণ করেছে। এ জন্য তাকে (ডিবাকর) হুমকি-ধামকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ ওঠেছে।
সূত্র জানায় , কার্গো আমদানি শাখায় সহকারি ব্যবস্থাপক হিসেবে ডিবাকর যোগদানের পর থেকে গত ফেব্রুয়ারি থেকে আবার বিমানের চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের বিল বিমানের ফান্ডে সংগ্রহ করা শুরু হয়েছে। সে থেকে প্রতি চার্টার ও নন সি্িডউল ফ্লাইটে প্রতিদিনব কম-বেশি ৪ লাখ টাকা এবং মাসে ১ কোটি টাকা বিমানের ফান্ডে জমা করা হচ্ছে। কিন্ত গত ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিমানের চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের এক টাকাও বিমান ফান্ডে জমা হয়নি।
সূত্র জানায়, প্রতি সপ্তাহে ৩/৪টি চার্টার ফ্লাইট শাহজালালে অবতরণ করে থাকে। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিমানের চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের যে পরিমাণ রাজস্ব ফাকি দেয়া হয়েছে তার পরিমাণ ৫ শ’ কোটি টাকা ছাড়িবে যাবে। এই ৫ শ’ কোটি টাকার লুটপাট করে তা ধামাচাপা দেয়ার পায়তারা করা হচ্ছে। আমদানি শাখার সহকারি ব্যবস্থাপক ডিবাকরকে ম্যানেজ করার দেনদরবার চলছে। দেনদরবারে ডিবাকর ম্যানেজ না হলে তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার হুমকি-ধামকি অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠেছে।
সূত্র জানায়, বিমানের চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের ৫ শ’ কোটি টাকার লুটপাটের হোতা সহকারি ব্যবস্থাপক আলমগীরকে পদোন্নতি দিয়ে বিমানের হংকংয়ের কান্ট্রি ম্যানেজার করা হয়েছে। আলি আহসান বাবুকে পদোন্নতি দিয়ে পরিচালক মার্কেটিংএন্ড সেলস করা হয়েছে। অসীম, মাহফুজ স্ব স্ব অবস্থানে বহাল, জিএম কার্গোভিলেজ আরিফ এ ব্যাপারে চুপচাপ।
এ ব্যাপারে জানতে কার্গো আমদানি শাখার সহকারি ব্যবস্থাপক ডিবাকর দেওয়ানজির সেল ফোনে গত ১৫ মে দুপুরে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করে জানান, এ ব্যাপারে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সার্কুলার জারি করেছে বিমান কর্তৃৃপক্ষ। অডিট আপত্তিতে বিষয়টি ধরা পড়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তবে কত টাকার অডিট আপত্তি তা তিনি বলতে পারেননি। বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করে জনসংযোগ বিভাগের শাকিল মেরাজের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
বিমানের ৩শ’ টিকিট জালিয়াতি : বাংলাদেশ বিমানের ক্রিকেট টিমের ৩শ’ টিকিট জালিয়াতির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।
সূত্রমতে বিমানের ক্রিকেট টিমের নামে ফ্রি ৩শ’ টিকিট হজ্ব যাত্রীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে বিমানের বর্তমান এমডি, তৎকালিন জিএম, ঢাকা সেলস অফিস গাজিপুরে বিশাল বাগান বাড়ি করেছেন- যা তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে। এই ৩শ’ টিকিট জালিয়াতির আরেক হোতা তৎকালিন সহকারি ব্যবস্থাপক ও বিমানের ক্রিকেট টিমের ম্যানেজার, বর্তমানে পরিচালক মার্কেটিং এন্ড সেলস আলি আহসান বাবু এমডির বন্ধু ও বিমানের চেয়ারম্যানের ক্লাসমেট হওয়ার সুবাধে আগের টিকিট জালিয়াতির কোটি টাকার ঘটনা এবং অতি সম্প্রতি বিমানের চার্টার ও নন সিডিউল ফ্লাইটের গত ৫ বছরে বিমানের রাজস্ব খাতের প্রায় ৫ শ’ কোটি টাকার লুটপাটের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার পায়তারা করা হচ্ছে।