একুশে বার্তা প্রতিবেদন : ঢাকা-হ্যানয় সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং আজ ৪ মার্চ রোববার তিনদিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন। সফরকালে তিনি রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করবেন। দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও। সে সময় উভয় দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
ভিয়েতনাম প্রেসিডেন্টের সফর পুরোপুরি দ্বিপক্ষীয় ও বাণিজ্য সম্ভাবনা সংক্রান্ত একটি সফর। এ সফরে দুই দেশের মধ্যে আয়োজিত হবে ‘বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম বিজনেস ফোরাম’। দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এ ফোরামে অংশ নেবে। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী হিসেবে আসছে দেশটির ১০০ প্রতিষ্ঠানের দুই শতাধিক ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে গঠিত প্রতিনিধি দল। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করে দেখবেন। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবেন তারা।
ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনার পর বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সফর শেষে আগামী ৬ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করবেন ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট।
২০১২ সালের নবেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিয়েতনাম সফর করেন। সে সময় ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন তারা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টকে ঢাকা সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ঢাকায় আসছেন। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট বর্তমানে ভারত সফরে রয়েছেন। তিনি দিল্লী থেকে ঢাকায় আসছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিয়েতনাম সফরকালে উভয় দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চারটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এছাড়া বাংলাদেশ ভিয়েতনাম থেকে দীর্ঘদিন ধরে চাল আমদানি করে আসছে। অতীতে ভিয়েতনামই মূলত বাংলাদেশে চালের চাহিদা মিটিয়েছে। যদিও এখন ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানি কমেছে।
ভিয়েতনাম বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানি করছে। তবে বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পরিমাণে ওষুধ নিতে চায় দেশটি। কেননা বাংলাদেশের ওষুধের প্রতি ভিয়েতনাম বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সে কারণে ভিয়েতনামের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় বাংলাদেশ থেকে ওষুধের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এছাড়া বাংলাদেশ জাহাজ শিল্পে বিশেষ অগ্রগতি করেছে। বাংলাদেশ থেকে জাহাজ কেনার বিষয়েও ভিয়েতনাম আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। কেননা দুই দেশই দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সে কারণে উভয় দেশই দীর্ঘদিন ধরে একে অপরকে সহযোগিতা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের আগস্টে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ভিয়েতনাম সফর করেন। সে সময় বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর প্রতি জোর দেন।
বাংলাদেশের রফতানির অন্যতম দেশ ভিয়েতনাম। ১৯৯০ সালে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য শুরু। দেশটিতে মূলত রফতানি হচ্ছে রাসায়নিক দ্রব্য, হিমায়িত খাদ্য, লেদার, কাঁচাপাট, কৃষিজাত দ্রব্য, পাটজাত দ্রব্য, তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার ইত্যাদি। আর ভিয়েতনাম থেকে চাল ছাড়াও আমদানি হচ্ছে, মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী, শাকসবজি, মিনারেল, ওষুধ ও সিরামিক পণ্য।
প্রেসিডেন্টের সফরসূচী : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রোববার বিকেল চারটায় ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানাবেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। বিমানবন্দর থেকে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আসবেন। বাংলাদেশে অবস্থানকালে তিনি সেখানেই থাকবেন।
একই দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে ভিয়েতনামী প্রেসিডেন্ট কুয়াংয়ের বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
সোমবার সকাল আটটার দিকে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে একটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। সেখানে তিনি একটি গাছের চারা রোপণ করবেন এবং দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করবেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি সাড়ে নয়টায় ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করবেন। একইদিন সকাল দশটায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে বৈঠক করবেন। বৈঠকে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বৈঠকের ফল জানানো হতে পারে।
কার্যসূচী অনুযায়ী সোমবার বেলা তিনটা ৪০ মিনিটে তিনি জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্স পরিদর্শন করবেন। সেখানে স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তার সঙ্গে একটি বৈঠক করবেন। এর আগে বেলা আড়াইটায় হোটেল সোনারগাঁওয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করবেন। বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) সভাপতি মোঃ শফিউল ইসলাম বিকেল তিনটায় ভিয়েতনামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করবেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেখানে তার সম্মানে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টায় বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ প্রধানের সঙ্গে একটি সৌজন্য সাক্ষাত করবেন ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট। তিনি ভিয়েতনাম-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের একটি বৈঠকে যোগ দেবেন। পরে তিনি ‘ভিয়েতনাম কালচারাল ডেজ ইন বাংলাদেশের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট মঙ্গলবার ঢাকা ছেড়ে যাবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানাবেন।
