একুশে বার্তা ডেক্স : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নানা অব্যবস্থাপনার কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চোরাকারবারি চক্র। বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি পয়েন্টে নেই সিসিটিভি (ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা)। যে কটি আছে, সেগুলোও বেশ পুরনো। দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে ভিআইপি চেকইন পয়েন্টের স্ক্যানার মেশিন। হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সের ৮ নম্বর গেটেও নেই ভেহিকল স্ক্যানার; নেই ম্যানুয়াল স্ক্যানারও। নিরাপত্তার এমন নাজুক অবস্থার সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চোরাকারবারি চক্র। তাদের দৌরাত্ম্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থাও।
ঢাকা কাস্টম হাউসের একজন কর্মকর্তা জানান, ভিআইপি লাউঞ্জে যে স্ক্যানার মেশিন রয়েছে, সেটি মেরামতের চেষ্টা চলছে। যদি মেরামত সম্ভব না হয়, তা হলে নতুন স্ক্যানার মেশিন আনার বিষয়টিও মাথায় রয়েছে। হ্যাঙ্গার কমপ্লেক্সের ৮ নম্বর গেটে ভেহিকল স্ক্যানার মেশিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মেশিনটির দাম প্রায় ২০ কোটি টাকা। এটি আনার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনাল ভবনের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নেই সিসি ক্যামেরা। নেই কাস্টমসের স্ক্যানারও। বিশেষ করে ভিআইপিরা যে চ্যানেল দিয়ে বের হন, সেখানে নেই কোনো স্ক্যানার। কার্গো গেটেরও একই অবস্থা। ফলে বিমানবন্দরের ভেতরে এয়ারসাইট থেকে গাড়িগুলো বের হচ্ছে কোনো ধরনের তল্লাশি ছাড়াই। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হ্যাঙ্গার গেটে দাঁড়িয়ে থাকা আনসার, এপিবিএন, বিমান ও সিভিল অ্যাভিয়েশনের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীদের চোখের সামনে দিয়েই অহরহ বের হচ্ছে গাড়ির পর গাড়ি। কিন্তু কোন গাড়িতে কী যাচ্ছে, সে সম্পর্কেও নেই কারো কোনো ধারণা। সিসিটিভির অবস্থা আরও নাজুক। ফলে গোটা এয়ারপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ অনেক পয়েন্টই থেকে যাচ্ছে সিসিটিভির আওতার বাইরে । এ সুযোগে ভিআইপি গেট দিয়ে সংশ্লিষ্ট কোন কোন কর্মকর্তার প্রটোকলে অবাধে নন ভিআইপিরাও পার হয়ে যাচ্ছে। একটি বহুজাতিক কোম্পানির এক কর্তা ব্যক্তির সাথে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার বিশেষ সম্পর্ক থাকায় তার প্রাইভেট কারটি বিমানবন্দরের ীভআইপিতে অবধে প্রবেশ করছে এবং ওই প্রাইভেট কারযোগে নন ভিাাইপিরা অবাধে যাতায়াত করছে।
এদিকে ভিআইপি যাত্রীরা ইমিগ্রেশন সেরে যে গেট দিয়ে বোর্ডিং ব্রিজ এলাকায় পৌঁছেন, সেখানে নেই কোনো স্ক্যানার মেশিন। ফলে বিদেশগামী ও ফেরত যাত্রীদের লাগেজ চলে যাচ্ছে চেক বা স্ক্যান ছাড়াই। একজন ভিআইপির সঙ্গে থাকেন জনাকয়েক অভ্যর্থনাকারী। তারাও আসা-যাওয়া করেন বেপরোয়াভাবে। অথচ স্ক্যানারের অভাবে তাদের সঙ্গে থাকা লাগেজ-ব্যাগেজ কিছুই চেক করার উপায় নেই। ভিআইপিদের জন্য ইমিগ্রেশনের সামনেই রয়েছে একটি স্ক্যানার। অথচ বছরের পর বছর ধরে নষ্ট অবস্থায় অচল পড়ে আছে মেশিনটি। স্ক্যানারটি মেরামতে বিমানবন্দরের কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় চিঠি দিয়ে কাস্টম কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, রাতদিন বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গার গেট দিয়ে বের হচ্ছে বিমানসহ বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের অপারেশনাল যানবাহন ও অন্যান্য অফিশিয়াল গাড়ি। এসব গাড়ি বিভিন্ন অজুহাতে বারবার বের হয়; আবার কিছুক্ষণ পরই ফিরে আসে। এখানেই সন্দেহ। এর মধ্যে ইচ্ছে করলে নিরাপত্তাকর্মীরা সন্দেহবশে অফিশিয়াল গাড়ি মাঝে মধ্যে চেক করতে পারেন। কিন্তু ভেতর থেকে ময়লার গাড়ি চেক করার কোনো সুযোগ নেই। যদি ময়লার গাড়িতে চোরাচালান সম্পর্কে একেবারে শতভাগ নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকে, তা হলে কেউ তাতে চেক করতেও ইচ্ছুক নয়।। এই হ্যাংগার গেট দিয়ে চোরাচালঅনের ঘটনা ঘটেছে এবং পুলিশ তা উদ্বারও করেছে, সংশ্লিষ্ট থানায় মামলাও হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল অ্যাভিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিনই বিভিন্ন দোকানপাট, রেস্টুরেন্টের ময়লা ও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের মলমূত্র ট্রাকে করে বাইরে আনে নাহিদ ট্রেডার্স নামের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। এসব ট্রাক দিনরাত ৮ নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকে, আবার বের হয়। কখনই তা চেক করা হয় না। বছর দুয়েক আগে সোনা ও মদের বোতল আটকের পর নাহিদ ট্রেডার্সের গাড়ি কিছুদিন বিশেষ নজরদারিতে ছিল। নাহিদ ট্রেডার্সের এক কর্মচারীও গ্রেফতার হয়েছিল।
এদিকে গোটা শাহজালাল বিমানবন্দরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এখনো রয়ে গেছে সিসিটিভির আওতার বাইরে। মূল টার্মিনাল ভবনসহ কার্গো ও হ্যাঙ্গার গেটে বর্তমানে মাত্র ২২০ সিসি ক্যামেরা সক্রিয়। অথচ বিমানবন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এর আওতাভুক্ত করতে হলে কমপক্ষে ৫০০ সিসি ক্যামেরা দরকার।
সম্প্রতি বিমানবন্দরের চারতলায় বিমানের নিরাপত্তা কর্মকর্তা রেজার রুম থেকে পৌনে দুই কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনা তদন্তের জন্য সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খোঁজা হয়। কিন্তু তদন্তকারীদের জানানো হয়, রুমটি ছিল সিসি ক্যামেরার আওতার বাইরে। শাহজালালে ভিআইপি গেটসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা ও স্ক্যানার লাগানোর জন্য বিভিন্ন সময় বৈঠকে তাগিদ দেওয়া হলেও সেটা করা হচ্ছে না। এটা দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
এপিবিএন অধিনায়ক রাশেদুল ইসলাম খান বলেন, ময়লার গাড়ি চেক করার উপায় কী? এপিবিএন শুধু দায়িত্ব পালন করে, যাতে কোনোও গাড়িতে করে কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। তার পরও আমরা সচেষ্ট রয়েছি।
বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কাজী ইকবাল করিম বলেন, সমস্যা নিরসনে নতুন করে অন্তত ৫০ সিসি ক্যামেরা জাইকার অনুদানে লাগানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আশা করা যাচ্ছে, কয়েক মাসের মধ্যেই বিমানবন্দরের গোটা এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
একটি এয়ারপোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থার মানদন্ড নির্ভর করে বিস্ফোরক দ্রব্য, গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র পাচার এবং চোরাচালানের ওপর। কিন্তু শাহজালালে রেডলাইন কাজ করছে শুধু যেন লন্ডন ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিয়ে। ওই ফ্লাইটে গোলাবারুদ ও অস্ত্র নিয়ে কেউ যাচ্ছে কিনা, সেটা প্রতিরোধ করার জন্যই কাজ করছে তারা। এ বিষয়ে বিমানের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি ভিত্তিতে রেডলাইন নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হলেও মাত্র এক কোটি টাকা ব্যয়ে গোটা বিমানবন্দরে সিসি ক্যামেরা লাগায়নি সিভিল অ্যাভিয়েশন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হিউম্যান স্ক্যানার। সেটাই নেই। একটা হিউম্যান স্ক্যানার থাকলে গোটা নিরাপত্তাব্যবস্থার অর্ধেকটাই সম্পন্ন হয়ে যায়। তিনি বলেন, বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দর সোনা পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। যদিও নিয়মিত চোরাচালান ধরা পড়ার দুটো অর্থ দাঁড়ায় প্রথমত, এই এয়ারপোর্ট দিয়ে টাকা-পয়সা খরচ করলে অনায়াসে চোরাই পণ্য পাচার করা সম্ভব বলেই স্মাগলারদের কাছে নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। সে জন্যই প্রতিদিন সোনা আসছে। দ্বিতীয়ত, চোরাচালান আগেও ছিল। এখন নিরাপত্তাকর্মীরা তৎপর বলেই ধরা পড়ছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেন, বিমানবন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসি ক্যামেরা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে চোরাচালানকারীদের শানক্তকরণ দুরূহ হয়ে পড়ে। বিমানবন্দরের পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরার নজরদারিতে এলে চোলাচালান চক্রের দৌরাত্ম্য অনেকাংশেই কমে আসবে। অপরাধীদের ভেতর ভীতি কাজ করবে বলে মনে করেন তিনি।
