আস্থার সঙ্কটে ইসি

আলী মামুদ : পরপর দুটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কর্মক্ষমতা, কার্যকারিতা ও দক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এতে করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১১তম) সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলকভাবে অনুষ্ঠিত করতে পারবে কিনা-সে বিষয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একটি জাতীয় সংসদ (পার্লামেন্ট) বহাল রেখে অবিকল আরেকটি জাতীয় সংসদ গঠনের উদ্দেশ্যে আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। বিশিষ্টজনের মতে বর্তমান নির্বাচন কমিশন শুধু দুর্বলই নয়, তারা অদক্ষও। উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলার জবাব দিতেও তারা পারছে না। এ বিষয়ে প্রখ্যাত নির্বাচন পর্যবেক্ষক ড. বদিউল আলম মজুমদার গত রবিবার বলেন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন হলেও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হঠাৎ স্থগিত হওয়ায় দেশবাসী বিমূঢ়। অবাক। একই সাথে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমরাও ক্ষুব্ধ। নির্বাচন কমিশনের সাবেক কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন মিডিয়াকে বলেন, নির্বাচন কমিশন জনগণের আস্থাহীনতায় ভুগছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আবদুল লতিফ মাসুম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচন স্থগিতের ঘটনায় অবাক হয়েছি। বিশিষ্ট আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের আইনজীবী এ প্রসঙ্গে বলেন, একটি সংসদ রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন হতে পারে না। ডাকসুর ভিপি সুলতান মোঃ মনসুর গাজীপুর সিটি নির্বাচন স্থগিতের ঘটনাকে ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন।

উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করাই নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ বা দায়িত্ব। স্থানীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা তারা করে সরকারের অনুরোধে। তাই বলে এই সিটি নির্বাচন আয়োজনে তাদের ব্যর্থতা এবার বড় করে চোখে পড়েছে। এছাড়া কুমিল্লা ও রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের মেয়র প্রার্থীরা নিদারুণভাবে পরাজিত হওয়ায় সরকারি মহলে ভীতির সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খুলনা সিটি নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থীর অবস্থাও করুণ। তিনি এখানে প্রার্থী হতেও আগ্রহী ছিলেন না বলে প্রকাশ।

স্থানীয় সরকারের হালচাল : স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু নয়, এই নির্বাচনে বিজয়ীদের দিয়ে এর পরিচালনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিগত সময়ে লক্ষ্য করা গেছে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা ব্যাপকভাবে বিজয়ী হয়েছেন। বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু তারা কি তাদের দায়িত্ব পালনে সরকারের সহযোগিতা বুঝে পাচ্ছেন? যদ্দুর জানা যায়, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান জনপ্রিয় মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল যে উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে হাত দিচ্ছেন, তাতে কাক্সিত সহযোগিতা করছে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। রাজশাহীর সরকারি দলের লোকজন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বাগড়া দিচ্ছেন। উন্নয়নমূলক কাজেও বাধা দিচ্ছেন। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে বিএনপির নেতাও সহযোগিতা পাননি। অথচ চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়রের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দিল দরিয়া। এতে আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্নও উঠেছে। এছাড়া যেসব সিটি বা পৌর মেয়র বিএনপির তারা প্রাপ্য সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বর্তমান এলজিআরডিমন্ত্রী খুবই পাওয়ারফুল ব্যক্তি বটে। অন্যান্য সময় দেখা যায় পার্টির মহাসচিবই এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থাকেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সরকারকালে তাই দেখা গেছে। বর্তমান সরকারের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এলজিআরডি দায়িত্ব পাননি। নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ আছে। : আমরা ক্ষুব্ধ. বদিউল আলম মজুমদার : স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচনে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবাই অবাক। এ বিষয়ে প্রখ্যাত নির্বাচন পর্যবেক্ষক ড. বদিউল আলম মজুমদারও অবাক। তিনি ক’দিন আগেও গাজীপুরের প্রার্থীদের নিয়ে চমৎকার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি গত রবিবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, আমরা ুব্ধ হয়েছি, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা দেখে। গাজীপুরের আগেও ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। সেই নির্বাচন কবে হবে তাও অনিশ্চিত। এই নির্বাচন কমিশন কিভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবে তা নিয়ে দেশবাসী সন্দিহান। একটি সংসদ বহাল রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন একটি বিরাট প্রশ্নও বটে। : নির্বাচন কমিশনের আমি শিথিলতা লক্ষ্য করছিÑব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) সাখাওয়াত হোসেন : এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ওপর স্থগিতাদেশের পর নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে আমি শিথিলতা ল্য করেছি। এর আগেও ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে একই ঘটনা ঘটেছিল। গাজীপুর তারই কার্বন কপি। ‘তবে গাজীপুর নির্বাচন ভোটের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। সেই সময়ই (ঢাকা সিটির স্থগিতের রায়) নির্বাচন কমিশনের অধিকারটা স্টাবলিস্ট করার প্রয়োজন ছিল যে, ইসিকে শুনানির সময় দেয়া হোক। ইসির কথা শুনে তো আদালত একটা জাজমেন্ট দেবে। কিন্তু এক মাস পর তারা (ইসি) আপিলে গিয়েছিল। কিন্তু এর ফলাফল কী হয়েছে আমরা কেউ জানি না। এসব কারণে নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।’ অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচন কমিশন নির্বাচন-সংক্রান্ত কোনো অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে দেখেও ‘লিখিত অভিযোগ না পাওয়া’র কথা বলে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন মিডিয়াকে বলেন, ‘গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ওপর স্থগিতাদেশের পর নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে আমি শিথিলতা ল্য করেছি। এর আগেও ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে একই ঘটনা ঘটেছিল। গাজীপুর তারই কার্বন কপি।  তবে গাজীপুর নির্বাচন ভোটের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। সেই সময়ই (ঢাকা সিটির স্থগিতের রায়) নির্বাচন কমিশনের অধিকারটা স্টাবলিস্ট করার প্রয়োজন ছিল যে, ইসিকে শুনানির সময় দেয়া হোক। ইসির কথা শুনে তো আদালত একটা জাজমেন্ট দেবে। কিন্তু এক মাস পর তারা (ইসি) আপিলে গিয়েছিল। কিন্তু এর ফলাফল কী হয়েছে আমরা কেউ জানি না। এসব কারণে নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।’ : এটি অদক্ষ নির্বাচন কমিশনÑড. আবদুল লতিফ মাসুম : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের স্থগিতাদেশের খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই অদক্ষ নির্বাচন কমিশন একাদশ সংসদ নির্বাচন কিভাবে করবে তা নিয়ে এখন ভাবতে হবে। মানুষ এদের প্রতি মোটেই আস্থা রাখতে পারছে না। পরপর দুটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় সরকারের কোনো ভূমিকা আছে কি না সেটাও দেখার বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। : একটি সংসদ রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন নয়Ñতৈমূর আলম খন্দকার : বিশিষ্ট আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, একটি সংসদ (পার্লামেন্ট) বহাল রেখে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করার যে ব্যবস্থা তা নজিরবিহীন। বর্তমান সরকার অন্যায়ভাবে এই ব্যবস্থাটি সংবিধানে ঢুকিয়েছে। এতে করে সংসদীয় ব্যবস্থাকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে। গত শনিবার চ্যানেল আইর তৃতীয় মাত্রা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সাজানো মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছে। প্রাপ্য জামিনও দেয়া হচ্ছে নাÑএটা নৈতিকতা বিরোধী। : এটি ষড়যন্ত্রÑসুলতান মোহাম্মদ মনসুর : ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোঃ মনসুর গত সোমবার জাতীয় প্রেসকাবের এক আড্ডায় সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে চা পান করছিলেন। প্রসঙ্গ ওঠায় তিনি গাজীপুর সিটি নির্বাচনের স্থগিতের ঘটনাকে সরাসরি ষড়যন্ত্রমূলক বলে অভিহিত করলেন। তিনি এই প্রতিবেদককে জানালেন, হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় হয়ত এই ঘটনার জন্ম দেয়া হয়েছে বলে মনে হয়। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আন্তর্জাতিক আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গতকাল প্রেসকাবে ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে একজন ড. কামালের সঙ্গে আলোচনার জন্য সময় চান। ড. কামাল তাকে জানালেন ঈদের পরে আসুন।