একুশে বার্তা ডেক্স : কষ্টে কষ্টেই জীবন কেটেছে রাজীবের। মারাও গেলো কষ্ট পেয়ে। ও সবসময় চাইতো কিভাবে একটু ভাল থাকা যায়। রাজীবের বন্ধুরা যখন বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেত, ও তখন পয়সা রোজগারে একটার পর একটা টিউশনি করতো। এই জীবনে কষ্ট ছাড়া ছেলেটা কিছুই পেল না…। চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন রাজীবের মামা জাহিদুল ইসলাম।
গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে চালকের খামখেয়ালিপনায় দুই বাসের চাপায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিলেও চিকিত্করা তার হাতটি আর শরীরে জোড়া লাগাতে পারেননি। এরপর থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৪ দিন চিকিৎসাধীন থেকে গত সোমবার গভীর রাতে রাজীব মারা যান। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে।
রাজীবের শিক্ষক সামাদ আজাদ তার সম্পর্কে একটি অনলাইন গণমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারিয়েছিলেন রাজীব হোসেন। এরপর ছোট দুই ভাই মেহেদি ও আবদুল্লাহকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমেছিলেন একুশ বছরের এই এতিম। কখনও খালার বাসায়, কখনও টিউশনি করে নিজে পড়াশোনা করেছেন এবং দুই ভাইকে কোরআনে হাফেজ বানিয়েছেন। রাজীবের স্বপ্ন ছিল- বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে একজন নামকরা শিক্ষক হবেন।’
গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে রাজীবের লাশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল ছোট দুইভাই মেহেদী ও আবদুল্লাহ। সঙ্গে ছিলেন তাদের মামা জাহিদুল ইসলাম ও খালা জাহানারা বেগম। জাহানারা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ছোট দুই ভাই মেহেদি ও আব্দুল্লাহকে নিয়ে সুখের স্বপ্ন দেখত রাজীব। তারা এখন বাড়িতে ভাইয়ের দাফন শেষে ঢাকায় এসে কোথায়, কার কাছে থাকবে, পড়াশোনার খরচই বা কোথা থেকে আসবে! সবই এখন অনিশ্চিত।
জাহানারা আরো বলেন, সরকার যদি এই দুই শিশুর দায়িত্ব নেয় তবে তাদের জীবন নষ্ট হবে না। তিনি সরকারের কাছে রাজীবের হত্যাকারী ঘাতক বাসচালকদের বিচার ও শাস্তির দাবি জানান। রাজীবের ছোট দুই ভাই যাত্রাবাড়ীর তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সপ্তম ও ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
রাজীবের মামা জাহিদুল ইসলাম জানান, এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া রাজীব নিজের রোজগারের টাকায় তিতুমীর কলেজে পড়াশোনা করতো। নিজের পড়ার খরচসহ ছোট দুই ভাইয়ের পড়ার খরচ চালাতে রাজীবকে টিউশনি, কম্পিউটার গ্রাফিক্স ও টাইপিংসহ বিভিন্ন কাজ করতে হতো। ছোটবেলা থেকে রোজগার করেই ছোট দুই ভাইকে কোরআনে হাফেজ বানিয়েছে। তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় এখন পড়াচ্ছে বাংলায়। পড়াশোনা শেষে নিজের চাকরি ও পরবর্তীতে দুই ভাইয়ের কর্মসংস্থান হলে তাদের সুখের সংসার হবে -এমন স্বপ্ন দেখতো রাজীব।
রাজীবের মেজ খালা খাদিজা বেগম লিপি জানান, দুপুরে হাইকোর্ট মাজার মসজিদ চত্বরে রাজীবের জানাজা হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহ নিয়ে রওনা হন গ্রামের বাড়ির পথে। সেখানে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই রাজীবকে দাফন করা হবে।
