খালেদা জিয়ার আকুতি : ‘বাঁ পা ঠিকমতো রাখতে পারি না, বাঁ হাতেও ব্যথা’

ডেক্স রিপোর্ট : চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দণ্ডিত হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে রাখা হয় পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে। এর ৫৯ দিনের মাথায় খালেদাকে নেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ৫ সেপ্টেম্বর  বুধবার কারাবন্দী থাকার ৬ মাস ২৪ দিনের মাথায় হুইল চেয়ারে করে খালেদা জিয়াকে কারাগারের ভেতরে স্থাপিত আদালতে নেওয়া হলো।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত খালেদা জিয়ার পরনে ছিল গোলাপি রঙের শাড়ি। তবে বুক থেকে পা পর্যন্ত সাদা কাপড়ে ঢাকা ছিল। তাঁর বাঁ হাতের ওপরও ছিল সাদা কাপড়। হুইলচেয়ারে বসে থাকা অবস্থায় তাঁকে কেবল ডান হাত নাড়তে দেখা যায়। যখন শুনানি চলছিল, তখন মাঝেমধ্যে ডান হাত চোয়ালে ঠেকাচ্ছিলেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটির বিচারকাজ চলছিল পুরান ঢাকার বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে স্থাপিত আদালতে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, শুনানির সময় খালেদা জিয়া হাজির হন না। বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। এরপর মঙ্গলবার বিকেলে আইন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপন দিয়ে পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারের একটি কক্ষকে আদালত ঘোষণা করে।

৫ সেপ্টেম্বর  জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার শুনানি থাকায় সকাল থেকে কারাগার ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সকাল ১০টার দিকে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজলসহ রাষ্ট্রপক্ষের অন্য আইনজীবীরা হাজির হন। তবে খালেদা জিয়ার কোনো আইনজীবীকে দেখা যায়নি। বেলা ১১টার দিকে আসেন বিচারক আখতারুজ্জামান। অবস্থান করেন কারাগারের ভেতরের আদালতের এজলাসের পাশের একটি কক্ষে, যা তাঁর খাসকামরা।

দুপুর সোয়া ১২টার দিকে খালেদা জিয়াকে হুইলচেয়ারে করে আদালতে আনা হয়। চারজন নারী কারারক্ষী তাঁকে আনেন। অবশ্য গৃহকর্মী ফাতেমাও খালেদা জিয়ার সঙ্গে এজলাস কক্ষে আসেন। এর পরপরই খালেদা জিয়া এজলাস কক্ষে থাকা বিএনপিপন্থী আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খানকে কাছে ডেকে নেন। মিনিট দুয়েক তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। আদালতের এজলাসকক্ষে বিচারক আসেন দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে।

এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি বিচারের কোন পর্যায়ে আছে, তা আদালতকে বলতে শুরু করেন দুদকের কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল। তিনি আদালতকে জানান, এখানে আদালত স্থাপনবিষয়ক প্রজ্ঞাপন খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়াকে দেওয়া হয়েছে। এ মামলায় দুদকের পক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি শেষ করেছে। আসামি জিয়াউল হক মুন্নার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

আদালত তখন আদালতে থাকা মামলার আসামি জিয়াউল হক মুন্না ও মনিরুল ইসলাম খানের কাছে জানতে চান, তাঁদের আইনজীবীরা কোথায়?

এ সময় আদালতে থাকা বিএনপিপন্থী আইনজীবী ও ঢাকা বারের সভাপতি গোলাম মোস্তফা খান আদালতকে বলেন, খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে নয়, একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে এখানে এসেছেন। আইনজীবীরা জানেন না, এখানে আদালত বসবে। তবে কয়েকজন আইনজীবী বকশীবাজারের আদালতে থাকতে পারেন।
তখন আদালত দুই আসামিকে বলেন, এক ঘণ্টার জন্য আদালত মুলতবি থাকবে। আপনাদের আইনজীবীদের এখানে আসতে বলেন।

এ সময় খালেদা জিয়া আদালতের উদ্দেশে বলেন, তিনি অসুস্থ। চিকিৎসক বলেছেন, এভাবে বসে থেকে বেশিক্ষণ পা ঝুলিয়ে রাখলে পা ফুলে যেতে পারে। হাতেও ব্যথা।
খালেদা জিয়া বিচারকের উদ্দেশে বলেন, এ অবস্থায় তাঁর পক্ষে বারবার আদালতে আসা সম্ভব না, যত দিন ইচ্ছা সাজা দিয়ে দিতে পারেন। সাজাই তো হবে, ন্যায়বিচার নাই এখানে।

২০ মিনিটের শুনানি শেষে আদালত এ মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ধার্য করে এজলাস থেকে নেমে যান।
আদালতকক্ষ থেকে নেওয়ার সময় খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাত দিন আগে এখানে আদালত বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাহলে কেন গতকাল (মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর ) প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। আমার আইনজীবীদের কেউ এখানে নেই। আমার আইনজীবীদের জানানো হলো না। এ আদালতে ন্যায়বিচার নেই।’
খালেদা আরও বলেন, ‘আমি আমার বাঁ পা ঠিকমতো রাখতে পারি না, প্যারালাইজড হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। বাঁ হাতেও অনেক ব্যথা।’

কারাগারে কেমন আদালত : গণমাধ্যমকর্মীসহ সব আইনজীবীর মুঠোফোন কারাফটকের সামনে রেখে দেন কারারক্ষীরা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কারাগারের ভেতর ঢোকার পর দেখা গেল, কারা প্রশাসনের ৭ নম্বর কক্ষের সামনে লেখা ‘অস্থায়ী আদালত’।

মূল এজলাসকক্ষের রং হলুদাভ। আয়তন আনুমানিক দৈর্ঘ্যে ৫০ ফুট, প্রস্থে ২০ ফুট। মেঝেতে বিছানো নীল রঙের কার্পেট। জ্বলছে ১২টি টিউব লাইট, চলছে নয়টি সিলিং ফ্যান।

কক্ষের পূর্বদিকে আছে পাঁচ হাত দৈর্ঘ্যের লাল সালু। সেখানে রাখা আছে একটি টেবিল। এর ওপর আইনবিষয়ক আটটি বই। এর পেছনে বিচারকের বসার চেয়ার। লাল সালুর দুদিকে আছে দুটি কাঠগড়া। ডান পাশের কাঠগড়াটি সাক্ষীদের জন্য, বাঁ পাশেরটি আসামির। সাক্ষীদের কাঠগড়ার রং সাদা। তবে আসামিদের কাঠগড়ার কাঠে সাদার পাশাপাশি কালো রং দেওয়া।

সাক্ষীর কাঠগড়ার কাছে সরকারি কৌঁসুলিদের (পিপি) বসার স্থান। ছোট্ট টেবিলের পেছনে তিনটি চেয়ার। সেখানে বসে ছিলেন দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল, আবদুল্লাহ আবু ও শাহ আলম তালুকদার। রাষ্ট্রপক্ষের এই টেবিলের সামনে রাখা ছিল কাঠের একটি চেয়ার। এর সামনে ছোট্ট একটা টেবিল। এর ওপরে পানির বোতল।

কক্ষটির পশ্চিম পাশে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বসার স্থান। পাশাপাশি দুটি টেবিল। এর পেছনে গোটা দশেক চেয়ার। আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী সেখানে না থাকলেও বিএনপিপন্থী আইনজীবী ও ঢাকা বারের   সভাপতি গোলাম মোস্তফা খান বসে ছিলেন।

এই এজলাসকক্ষের উত্তর দিকে আরেকটি কক্ষ আছে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বসে ছিলেন।
কয়েকজন কারারক্ষী জানালেন, অস্থায়ী আদালতের এজলাসকক্ষসহ অন্য কক্ষ কারা প্রশাসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আসামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য এখানে এসে ভিড় করতেন তাঁদের স্বজনেরা।

এজলাসকক্ষের একেবার পশ্চিম পাশের টিনশেডের কক্ষ থেকে দেখা যায়, কারাগারের ভেতরের কিছু অংশ। আছে সেখানে বড় বড় আমগাছ, সফেদাগাছ। প্রথম আলো