খালেদা জিয়ার জামিনের পর কুমিল্লায় হুকুমের মামলায় গ্রেপ্তারীপরোয়ানা জারি : জেল থেকে বের হতে বিলম্ব

একুশে বার্তা প্রতিবেদন : হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। কারাগারে যাওয়ার ৩৩ দিনের মাথায় জামিন পেলেন তিনি। বিচারিক আদালত থেকে আসা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার নথি দেখে গত সোমবার  খালেদা জিয়াকে ৪ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। এই সময়ের মধ্যে আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক প্রস্তুত করতে হবে। পেপার বুক প্রস্তুত হয়ে গেলে যেকোনো পক্ষ শুনানির জন্য আপিল উপস্থাপন করতে পারবে।

এদিকে নাশকতার অভিযোগে কুমিল্লায় দায়েরকৃত একটি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

ফলে তার জেলজীবন দীর্ঘায়িত হতে পারে। খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখাতে সরকারের আবেদনটি মঞ্জুর করেছে কুমিল্লা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট। সেই সঙ্গে আগামী ২৮ মার্চ খালেদা জিয়াকে কুমিল্লা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে হাজির করার আদেশও দিয়েছেন আদালত।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর বিকাল পাঁচটায় কুমিল্লা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এ আদেশ দিয়েছেন। এ মামলায় আমরা আগামী ১৩ মার্চ মুভ করবো।

ওদিকে হাইকোর্ট খালেদা জিয়ার বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা, কম সাজা, এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের আগে খালেদা জিয়ার জামিনে থাকা এবং জামিনের অপব্যবহার না করাসহ ৪টি যুক্তিতে খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর করেছেন। এর আগে রোববার খালেদা জিয়ার জামিন বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য ছিল। তবে, ওইদিন বিচারিক আদালতের নথি হাইকোর্টে বিলম্বে আসায় জামিন বিষয়ে আদেশের জন্য সোমবার দুপুর ২টায় সময় নির্ধারণ করেন হাইকোর্ট। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ের পরপরই খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার জামিন শুনানি শেষে এক আদেশে বিচারিক আদালতের নথি পাওয়া সাপেক্ষে জামিন প্রশ্নে আদেশ দেয়া হবে বলে উভয়পক্ষের আইনজীবীদের জানান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিচারিক আদালতের নথি রোববার দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে হাইকোর্টে এসে পৌঁছে। আদালতের ডেসপাচ শাখার কর্মকর্তারা নথি গ্রহণ করে তা হাইকোর্টের ফৌজদারি আপিল শাখায় পাঠিয়ে দেন। গত সোমবার আদেশের সময় এই নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি সাজার রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদার আইনজীবীরা। পরে ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের এই বেঞ্চ আপিল গ্রহণ করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে বিচারিক আদালতের দেয়া অর্থদণ্ডের আদেশ স্থগিত করেন। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার জামিনের আবেদনের শুনানির দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি ধার্য করে হাইকোর্ট এ মামলার বিচারিক আদালতের নথি তলব করেন যা ১৫ দিনের মধ্যে দাখিল করতে বলা হয় আদেশে।

গত সোমবার  দুপুর সোয়া ২টায় সংশ্লিষ্ট আদালতের এজলাসে আসন গ্রহণ করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিম। এর আগেই আদালতের এজলাস কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। উভয়পক্ষের আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও বিএনপির নেতারা খালেদা জিয়ার জামিন বিষয়ে আদেশ শোনার জন্য এজলাসে অপেক্ষা করতে থাকেন। অনেকে এজলাস কক্ষে প্রবেশ করতে না পেরে বাইরে অবস্থান নেন। শুনানির শুরুতে আদালত খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের কাছে জানতে চান তাদের কোনো সাবমিশন আছে কি-না? জবাবে জয়নুল আবেদীন বলেন, আমাদের কোনো সাবমিশন নেই। জামিন বিষয়ে আদেশের জন্য ধার্য আছে। এ সময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলের কোনো বক্তব্য আছে কি-না তা জানতে চান। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, এটি একটি সেনসেশনাল কেইস। আর টাকা যে উত্তোলন করা হয়েছে এর স্বপক্ষে বেস্ট ডকুমেন্ট রয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তারা (খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা) যে জামিনের দরখাস্ত দিয়েছেন সেখানে বলা হয়েছে তিনি (খালেদা জিয়া) অসুস্থ। কিন্তু আইনজীবীরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বলেছেন যে, তিনি সুস্থ। আদালতের উদ্দেশে অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, আপিল শুনানির জন্য একটি দিন ধার্য করে দিতে পারেন এবং পেপারবুক তৈরি করার আদেশ দিতে পারেন। শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, এখানে তো উনি (খালেদা জিয়া) প্রিন্সিপাল একিউজড (প্রধান আসামি)। আর সবকিছু কনসিডার করেই তো তাকে ৫ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে জয়নুল আবেদীন বলেন, উচ্চ আদালতের প্রথা আছে এ ধরনের শর্ট সেন্টেন্সের (কম সাজা) ক্ষেত্রে জামিন দেয়ার। এসময় তিনি উচ্চ আদালতের দুটি মামলার নজির উল্লেখ করে বলেন, সেখানে সাত বছরের সাজার ক্ষেত্রে আদালত জামিন দিয়েছিলেন। শুনানিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কারাবাস এবং জামিনের বিষয়টি উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ ধরনের একটি মামলায় এরশাদ সাড়ে ৩ বছর পর জামিন পেয়েছিলেন। উনিতো (খালেদা জিয়া) মাত্র ২ মাস কারাগারে আছেন। এ পর্যায়ে আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশ্যে বলেন, সাড়ে ৩ বছর সাজার বিষয়ে আপনি যার কথা বলছেন উনার বয়স তখন কত ছিল? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ৬৫ বছর। এসময় আদালত বলেন, ওই সময় উনি শুধু ফিজিক্যালিই ফিট ছিলেন না, জেল থেকে বেরিয়ে বিয়েও করেছিলেন। সন্তানের বাবাও হয়েছিলেন। শুনানিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান  জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, এই মামলায় দুইবারে মিলিয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) আড়াই মাসের বেশি সাজা ভোগ করেননি। তিনি এই মামলার মূল আসামি। কিন্তু ওনার বয়স, শারীরিক অসুস্থতা ও সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করেই বিচারিক আদালত তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। দুদক আইনজীবী আরো বলেন, সাজার পরিমাণ কম এটি জামিন পাওয়ার গ্রাউন্ড হতে পারে না। এসময় আদালত খুরশিদ আলমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার কথা অনুযায়ী মূল আসামিকে ৫ বছর আর অ্যাবেটরদের (সহযোগী আসামি) ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আপনারা কি সেটিসফাইড নন? জবাবে খুরশিদ আলম খান বলেন, আমরা সেটিসফাইড নই। শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জামিন বিষয়ে আদেশ দু’দিনের জন্য স্থগিত রাখার আবেদন জানান। তবে, আদালত সেটি বিবেচনায় নেননি। একপর্যায়ে আদালত খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা যে অসুস্থতার কথা বললেন সবই তো দীর্ঘ মেয়াদি। জবাবে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ওল্ড এইজে এরকম হয়। এরপরই হাইকোর্ট এক আদেশে ৪টি যুক্তিতে খালেদা জিয়াকে জামিন দেন। আদালত আদেশে উল্লেখ করেন, বিচারিক আদালত পাঁচ বছরের যে সাজা দিয়েছে তা তুলনামূলকভাবে কম। বিচারিক আদালতের নথি হাইকোর্টে এসেছে, কিন্তু আপিল শুনানির জন্য এখনো প্রস্তুত হয়নি। বিচারিক আদালতে মামলা চলাকালে খালেদা জিয়া জামিনে থেকে মামলা মোকাবিলা করেছেন এবং এর অপব্যবহার না করে আদালতে তিনি  নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন। বয়স এবং বয়সজনিত শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনায় নিয়ে তাকে জামিন দেয়া যায়। এসব যুক্তিতে হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে ৪ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই সময়ের মধ্যে পেপারবুক প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট আদেশে বলেন, পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে গেলে যেকোনো পক্ষ শুনানির জন্য আপিল উপস্থাপন করতে পারবে। আদালতের আদেশের পরপরই বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। বাইরে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীদেরও উল্লাস করতে দেখা যায়। এ সময় নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার নামে স্লোগান দেন। খালেদা জিয়ার পক্ষে আদালতে আরো উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, আব্দুর রেজাক খান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, কায়সার কামাল, জাকির হোসেন ভূঁইয়া প্রমুখ। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, রফিকুল ইসলাম মিয়া, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মঈন খান, মির্জা আব্বাস, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু প্রমুখ।