প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি সই : সংসদে আলোচনা না করে হঠাৎ চুক্তিতে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশিষ্টজনরা

আলী মামুদ : হঠাৎ করে প্রতিরক্ষা বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি স্বাক্ষরের খবরে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অবাক হয়েছেন। তারা এ সম্পর্কে গতকাল শনিবার বলেছেন, জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক বলে আমাদের সংবিধানে উল্লেখ আছে। কিন্তু জনগণের কোনো মতামত না নিয়ে, যে জাতীয় সংসদ রয়েছে তাতেও এ বিষয়ে আলোচনা না করে এমন চুক্তি করা হয়েছে। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তির আগে আলোচনার দরকার ছিল। এমনকি সংসদে আলোচনা হয়নি। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া গতকাল এ সম্পর্কে দৈনিক দিনকালকে বলেন, দেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির আগে যথেষ্ট আলাপ-আলোচনার দরকার ছিল। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করায় আমরা অবাক হয়েছি। এ বিষয়ে পার্লামেন্টেও আলোচনা হয়নি। : উল্লেখ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় ঋণ বাস্তবায়ন এবং সার্বিক সহযোগিতা বিস্তার ঘটাতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ৪টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারকে ভারত প্রতিরক্ষা খাতে ৫শ’ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছে এবং সেই অর্থ ব্যয়ের রূপরেখাও ঠিক করা হয়েছে চুক্তিতে। এছাড়াও আরো ৩টি চুক্তি সই হয়েছে। গত বুধবার নয়াদিল্লিতে তিন দিনের বৈঠক শেষে এই চুক্তি সই হয়। শুক্রবার বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে খবরটি জানা গেছে। : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সচিব সঞ্জয় মিত্রের বৈঠক হয়। এতে স্বাক্ষরিত প্রথম চুক্তিটি হলো, বাংলাদেশ-ভারত কাঠামোগত সহযোগিতা চুক্তি। যাকে বলা হচ্ছে, ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি। প্রতিরক্ষা সামগ্রী কেনার জন্য ভারত বাংলাদেশকে যে পাঁচশ মিলিয়ন ডলার ঋণের ঘোষণা দিয়েছে তা দিয়ে বাংলাদেশের যা প্রয়োজন এবং ভারতের যা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে সেই ভিত্তিতেই প্রতিরক্ষা সামগ্রী কেনা হবে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভারতের কাছে চাহিদা অনুসারে দাবিপত্র পেশ করবে। দ্বিতীয় চুক্তিটি হলো, খুলনায় নৌবাহিনীর শিপইয়ার্ডের সঙ্গে ভারতের জাহাজ মন্ত্রণালয়ের। বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী নৌজাহাজ যৌথভাবে তৈরি করা হবে। তৃতীয় চুক্তিটি হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিরক্ষা কলেজ ও স্কুলের শিক্ষার্থী বিনিময়। এতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। হাই কমিশন সূত্রে জানা যায়, প্রতিরক্ষা খাতে যে ৫০ কোটি ডলার ভারত ঋণ দিয়েছে তার পুরোটা যে ভারত থেকে আমদানির মাধ্যমে খরচ করতে হবে, তা নয়। চুক্তির একটা অংশ (প্রায় ৩৫ শতাংশ) তৃতীয় দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনে বাংলাদেশ খরচ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ভারতের অনুমতি নিতে হবে। ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতার বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে যথেষ্ট স্পর্শকাতর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের আগে থেকেই এই সমঝোতা নিয়ে বাংলাদেশে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হলে বাংলাদেশে সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে কি না, সেই সংশয় বিভিন্ন মহল প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেই সব আশঙ্কা উপেক্ষা করে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। গত বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় উভয় দেশের মধ্যে সর্বপ্রথম প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সেই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের জন্য দিল্লিতে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে এটাই প্রথম প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বৈঠক। পরের বৈঠক ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। (সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রথম আলো)। : গতকাল শনিবার বাংলাদেশ-ভারত প্রতিরক্ষা চুক্তির খবর দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। রাজধানীর বিভিন্নস্থানে এনিয়ে আলাপ-আলোচনার খবর পাওয়া যায়। এ বছরের শেষ দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১১তম) হওয়ার যে কথা রয়েছে, তার আগে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করায় মানুষ অবাক হয়েছে। বিশেষ করে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভারতীয় অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যেভাবে বাংলাদেশে এসে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার (ঝটিকা কূটনীতি) করেছিলেন তার প্রেক্ষিতে আগামী ১১তম সংসদ নির্বাচনেও ভারতীয় ভূমিকা থাকবে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। : এদিকে গতকাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান দৈনিক দিনকালকে বলেন, এমন একটি চুক্তির আগে যে আলাপ-আলোচনার কথাও করা হয়নি। তিনি বলেন, এতে করে জনগণকে অবাক করা হয়েছে। বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এর আগে ভারত-বাংলাদেশ সামরিক চুক্তির কি পরিণতি হয়েছিল, তা মাথায় রাখা উচিত ছিল। পার্লামেন্টে এটা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা উচিত ছিল। বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন গতকাল বলেন, এমন একটি চুক্তির আগে সংসদেসহ ব্যাপক আলোচার দরকার ছিল। সূত্র : দিনকাল