কামরুল হাসান দর্পণ : বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ভারতের যেন ততই ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। নির্বাচন কেমন হবে, কীভাবে হবে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে পারে-এ নিয়ে তার যেন বিশ্লেষণের শেষ নেই। দেশটির পত্র-পত্রিকা ও বিশ্লেষকরা কিছুদিন পরপরই সম্পাদকীয়, নিবন্ধ ও গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশ করছে। বাংলাদেশকে বিভিন্নভাবে নসিহতও করছে। তাদের ভাব এবং আচার-আচরণ এমন যে, তারা নিজেদের দেশ নিয়ে যতটা না উদ্বিগ্ন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার চেয়ে বেশি উৎকণ্ঠিত। তারা ধরেই নিয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই তাদের একমাত্র বন্ধু এবং আগামী নির্বাচনে যদি দলটি ক্ষমতায় না আসতে পারে, তবে তার যেন বিশাল ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই তাদের বিভিন্ন লেখায় ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা থাকে, যে করে হোক আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় আসতে হবে এবং ক্ষমতায় আসতে সব ধরনের সহযোগিতা করা উচিত। এজন্য তারা ভারত সরকারকেও বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে থাকে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তাদের বেশিরভাগ নিবন্ধ ও গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের জঙ্গী উত্থানের বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয়। ভাবখানা এমন, বাংলাদেশ জঙ্গীতে ভরে গেছে এবং এই জঙ্গীরা যেন তাদের ওপর হামলে পড়বে। অথচ নিজেদের দেশে যে চরম উগ্র হিন্দুত্ববাদী জঙ্গীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। এ ব্যাপারে তাদেরকে কোনো গবেষণা বা উদ্বেগ প্রকাশ করে নিবন্ধ প্রকাশ করতে দেখা যায় না। তাদের যত দৃষ্টি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ দিকে। ভারতের এ আচরণে ‘মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি’ দিকটিই প্রকাশিত হচ্ছে। এজন্য কিছু দিন পরপর দেশটির গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও সচিবদের বাংলাদেশ সফর করতে দেখা যায়। কয়েক দিন আগে সফর করে গেছেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে। আগামী জুনে আসছেন বণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী সুরেশ প্রভু। এসব সফরকে সাধারণত দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও, নেপথ্যে যে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, তা একজন সাধারণ মানুষও বোঝে। বাংলাদেশ সরকার এবং তার সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা খুব মনোযোগ সহকারে ভারতের এসব শলা-পরামর্শ শোনেন। ক্ষমতাসীন দলও ভারতের এসব পরামর্শ খুব আমল দেন এবং আশ্বস্থও হন। বলা যায়, ক্ষমতাসীন দলের প্রশ্রয়ে ভারত বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে এবং কখনো কখনো তা বাস্তবায়ন করতে দ্বিধা করে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারত তার তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে পাঠিয়ে যেভাবে ক্ষমতাসীন দলকে দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচনটি করিয়ে নেয়, তা ছিল নজিরবিহীন। এই হস্তক্ষেপকে পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন দলের নেতৃবৃন্দ ভারতের ‘বন্ধুত্বের নিদর্শন’ হিসেবে বর্ণনা করতে লজ্জিত বা কুণ্ঠিত হয়নি। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে, টেলিভিশন টক শোতে ভারতকে ‘মহান বন্ধু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এ হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানাতে দেখা গেছে। একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচনে প্রতিবেশি দেশ বা অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ করা যে আত্মমর্যাদাহানিকর, এমনকি স্বাধীন সত্তার ওপর হস্তক্ষেপের শামিল, তা তারা কিছুতেই মানতে চাননি, এখনও চাচ্ছেন না। কেবল মাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বন্ধুত্বের মোড়কে ভারতকে আভ্যন্তরীন ব্যাপারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। সেই থেকে ভারত প্রকাশ্যেই বাংলাদেশের যে কোনো আভ্যন্তরীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করে যাচ্ছে। গত ১৮ এপ্রিল বিবিসি বাংলা ভারতের অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন-এর গবেষণা হিসেবে সাংবাদিক মনোজ যোশীর লেখা এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন কেমন হতে পারে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হতে পারে-নিয়ে তার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এ প্রতিবেদনে প্রকারন্তরে ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
দুই.
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে বরাবর দাবী করে আসছে। অন্যদিকে নির্বাচন বর্জনকারী বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপি বরাবরই বলে আসছে ঐ নির্বাচনে ৫ শতাংশও ভোট পড়েনি। তবে ভোটের হার নিয়ে মনোহর যোশী তার নিবন্ধে বলেছেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে যে নির্বাচন হয়, তাতে মাত্র ২২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। মনোজ যোশীর এ মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ভোটের হারে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য ছিল না। ভোটের হারে এ নির্বাচন যে গ্রহণযোগ্য ছিল না তা বাংলাদেশে অতীতের জাতীয় নির্বাচনে ভোটের হারের সাথে তুলনা করলেই বোঝা যায়। যাই হোক, মনোজ যোশী তার নিবন্ধের এক অংশে মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশে যে নির্বাচন এ বছরের শেষে হওয়ার কথা, সেটিকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই ধরনের আশংকার কথা বলেছেন। প্রথমত, সবচেয়ে খারাপ যে পরিস্থিতির দিকে বাংলাদেশ যেতে পারে তা হলো সেখানে (বাংলাদেশে) সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হয়ে ইসলামী গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে (হেফাজত ইসলাম)। দ্বিতীয়ত, পরিস্থিতিতে সেনা সরকার গঠিত হতে পারে, যেটি দেশটির ইতিহাসে এর আগে কয়েকবার ঘটেছে। যোশীর এ মন্তব্যে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তিনি প্রচ্ছন্নভাবে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার প্রথম মন্তব্য সম্পর্কে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারা সম্পর্কে তার যথেষ্ট ধারণা নেই। তিনি হয়তো জানেন না, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান এবং শান্তিপূর্ণ সহবস্থানে বিশ্বাসী। স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতি, সমাজনীতি এবং রাষ্ট্রনীতিতে ইসলামিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রভাব থাকবে। ফলে ইসলামীভাব ধারার রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাবে বা বিরোধী দলে থাকবে-এটা অবাস্তব কিছু নয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট ও বিএনপি নেতৃত্বধীন জোটে বেশ কয়েকটি ইসলামী দল রয়েছে। এ দলগুলো যদি দেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যায়, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। আর ইসলামীভাবধারার কোনো দল যদি ক্ষমতায় আসে, তাতে ভারতের সমস্যা কি? ভারতে যে একটি হিন্দুত্ববাদী দল ক্ষমতাসীন এবং সেখানে যে উগ্র হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তা নিয়ে কি আমরা কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেছি? তার মতো বাংলাদেশে কি এ ধরনের উগ্রবাদের সৃষ্টি হয়েছে? হয়নি এবং হওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের ক্ষমতাসীন দলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল যখন উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেয়, তখন সে দেশে জঙ্গীগোষ্ঠীর আস্ফালন কতটা বৃদ্ধি পায়, তা ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি দেখলেই বোঝা যায়। কাজেই যোশীর উচিত বাংলাদেশের দিকে না তাকিয়ে বা বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ না করে তার নিজের দেশের দিকে তাকানো। এ নিয়ে গবেষণা করে লেখালেখি করা। যোশীর দ্বিতীয় মন্তব্যের ব্যাপারে বলতে গেলে বলা যায়, তিনি সঠিক কথাই বলেছেন এবং এটা নিয়ে গবেষণারও কিছু নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো যখন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় এবং এ নিয়ে হানাহানিতে লিপ্ত হয়, তখন সেনা সরকার গঠিত হওয়ার নজির রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের মাধ্যমে আমরা তা দেখেছি। অবশ্য এর আগে রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার নজিরও রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ক্ষমতাসীন দল যেভাবে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকতে উঠেপড়ে লেগেছে এবং ভারতের সমর্থন পেতে দৌড়ঝাপ শুরু করেছে, তাতে আপাতত রাজনৈতিক সমঝোতার পথটি ক্ষীণ হয়ে আসছে। দলটি মনে করছে, ভারত যদি তার পাশে থাকে, তবে তার ক্ষমতায় থাকা সুনিশ্চিত এবং তাকে ক্ষমতা থেকে কেউ সরাতে পারবে না। এজন্য দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন প্রতিনিধি দল বিগত কয়েক মাসে ঘন ঘন ভারত সফর করেছেন। সর্বশেষ গত ২২ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ১৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফরে যায়। সেখানে তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিজেপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, লোকসভার স্পিকারের সাথে বৈঠক করেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলের আরও নেতৃবৃন্দ হয়তো ভারত সফরে যাবেন। এসব সফরের নিগূঢ় অর্থ কি, তা বোধ করি দেশের সাধারণ মানুষের বুঝতে অসুবিধা হয় না।
তিন.
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ যে একমাত্র ভারতের সমর্থনকে তার ক্ষমতায় টিকে থাকার উৎস মনে করে, তা তাদের কথা-বার্তা ও আচার-আচরণে দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারত যদি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ যে কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও হস্তক্ষেপ করে তাতে দলটি যেন খুশিই হয়। দলটি ভারতের প্রতি এতটাই সন্তুষ্ট ও কৃতজ্ঞ যে, দেশটি এ পর্যন্ত যা চেয়েছে তাই অকাতরে দিয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবীটুকু আদায় করতে পারেনি। এর কারণ হতে পারে, দলটি হয়তো মনে করছে, দেশের ন্যায়সঙ্গত দাবী আদায়ে খুব বেশি চাপ দিলে ভারত তার ক্ষমতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে সমর্থন নাও দিতে পারে। এ ধরনের ভয় হয়তো তার মধ্যে কাজ করছে। তাই ক্ষমতায় থাকার মোহে ভারত কর্তৃক দেশের কতটা লাভ ও ক্ষতি হচ্ছে তা বিবেচনায় নিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, লেখক ও বিজ্ঞানী জেমস ফ্র্যাঙ্কলিন ১৭৭৫ সালের ১৭ ফেব্রæয়ারি পেনসিলভেনিয়ার এক অ্যাসেম্বলিতে জনগণকে দেশের মূল্য বোঝার জন্য এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘দৌজ হু উড গিভ আপ এসেনশিয়াল লিবার্টি টু পারচেজ এ লিটল টেম্পোরারি সেফটি, ডিজার্ভ নাইদার লিবার্টি নর সেফটি’। অর্থাৎ যারা সাময়িক নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়, তারা যেমন স্বাধীনতার যোগ্য নয়, তেমনি নিরাপত্তা পাওয়ারও যোগ্য নয়। ক্ষমতাসীন দল যেন এ কথাটি ভুলে নিজ স্বার্থ উপেক্ষা করে শুধু ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সব আবদার মেনে নিচ্ছে এবং তার পেছনে ছুটছে। ২২ এপ্রিল ভারত যাওয়ার আগে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে ভারতকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তাকে তোষামোদী ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এতে দেশের সচেতন মানুষ অবাক ও বিস্মিত হয়েছে। যদিও তারা বরাবরই মনে করে আসছে, এই তোষামোদী আওয়ামী লীগের জন্য নতুন কিছু নয়। সংবাদ সম্মেলনে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসির একটা বিউটি আছে। তারা অন্য দেশের আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না। অন্যান্য দেশ এ বিষয়ে খুব দৌড়াদৌড়ি করে। অনেক দেশ ছুটাছুটি করে। কিন্তু ইন্ডিয়া এইগুলো করে না।’ এ কথাটি যে ঠিক নয় ওবায়দুল কাদেরের তা অজানা নয়। তার এ বক্তব্যটি যদি ভারতের ক্ষমতাসীন দলের কারো কাছ থেকে শোনা যেত, তাহলে একটা কথা ছিল। বলা যেতো প্রতিবেশী দেশের আভ্যন্তরীন বিষয়ে নাক গলানো থেকে হয়তো ভারত সরে এসেছে। আগ বাড়িয়ে ভারতের পক্ষে ওবায়দুল কাদেরের এমন তোষামোদি বক্তব্য শুনে ‘ঠাকুর ঘরে কে রে; আমি কলা খাই না’ প্রবাদটির কথা সাধারণ মানুষের মনে পড়তেই পারে। তার বক্তব্যে মানুষ এও আবার মনে করতে পারে, আগামী নির্বাচনে ভারত যদি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো হস্তক্ষেপ করে, তবে তা হস্তক্ষেপ হবে না। এজন্য তিনি আগেভাগেই এ বক্তব্য দিয়ে রেখেছেন। ভারতের এই সাফাই গাইতে গাইতেই তিনি দলবল নিয়ে ভারত সফর করে এসেছেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের মুখে ভারতের এমন উচ্ছ¡সিত প্রশংসা এবং অন্য দেশগুলোর বদনাম করা থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক, অন্য কোনো দেশের সমর্থন না পেলেও চলবে, কেবল ভারত পাশে থাকলেই হবে। ক্ষমতাসীন দল হয়তো ধরেই নিয়েছে, আগামী নির্বাচনে ভারত যদি সমর্থন দেয় এবং তা যতই বিতর্কিত হোক, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো সে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোকেও ম্যানেজ করে দেবে। ভারতও ক্ষমতাসীন দলের এই দুর্বলতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে কসুর করছে না। সে একদিকে তার সব স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশকে কীভাবে চলতে হবে এ নসিহতও করছে। এবং ভারত তা বিলক্ষণই করবে! কারণ ভারত দেখছে, তার আশপাশের অন্যান্য প্রতিবেশি দেশগুলো তার প্রভাব বলয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধমকও খাচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশ সরকার ছাড়া অন্য দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। কিছুদিন আগে ছোট্ট মালদ্বীপ তার আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার জন্য ভারতকে যেভাবে ধমক দিয়েছে, তাতে ভারতকে চুপসে যেতে হয়েছে। এভাবে নেপাল, ভুটানের মতো দেশ থেকেও প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। আর চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে তো তার দা-কুমড়া সম্পর্ক। ফলে এখন বাংলাদেশ ছাড়া তার ঘনিষ্টতম প্রতিবেশি বলতে আর কেউ নেই বললেই চলে। এ বাস্তবতায়, বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে রাখা ছাড়া তার উপায় নেই। দাদাগিরি ফলানোর তার এই একটি দেশই রয়েছে। বাংলাদেশও যদি কোনোভাবে ছুটে যায়, তাহলে তাকে অনেকটা একঘরে হয়ে পড়তে হবে। তাই সে বাংলাদেশের রাজনীতি, কথিত ও কল্পিত জঙ্গী উত্থান এবং ভবিষ্যত নিয়ে অতিমাত্রায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছে। বলা বাহুল্য, ভারত এই উদ্বেগ প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে, আমাদের সরকারের অতি ভারতপ্রীতির কারণে।
চার.
প্রতি মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন ঘটছে। প্রভাবশালী দেশগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কাছে টানছে এবং তাদের সাথে মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ভারতের ক্ষেত্রে। দেশটি মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়নের পরিবর্তে দাদাগিরির মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ সম্পর্কের প্রতি বেশি মনোযোগী। অথচ তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এবং তার চেয়ে অর্থনীতি ও অন্যান্য দিক থেকে শত গুণ এগিয়ে থাকা চীন বাংলাদেশসহ ভুটান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মতো দেশগুলোতে ভারতের মতো আগ্রাসী নীতি অবলম্বন না করে সমমর্যাদার সম্পর্কের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে। দেশগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে নিজেও সুবিধা নিচ্ছে, তাদের উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশগুলোও চীনের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেছে। চীনের প্রতি দেশগুলোর জনগণও খুশি। অথচ চীনের যে শক্তি তা দিয়ে দেশগুলোর রাজনীতি ও আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা নাক গলানো তার পক্ষে কোনো ব্যাপারই না। সে এ কাজ করেনি। ভারত ঠিক এর বিপরীত কাজটি করে চলেছে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলোর জনগণের মধ্যে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ ভারত তার প্রতিবেশি দেশগুলোর জনগণের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করা ছাড়া সন্তুষ্টি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তার প্রতিবেশি দেশগুলোর সাথে তার সম্পর্কের নীতিতে এটাই প্রতীয়মাণ হয়, সে মনে করছে, কেবল সরকারকে সমর্থন দিলেই দেশটির সাথে তার ভাল সম্পর্ক বজায় থাকবে, জনগণের সাথে সম্পর্কের দারকার নেই। তার এ নীতি যে ভুল তা তার অন্যান্য প্রতিবেশি দেশগুলোর প্রতিরোধের মুখে পড়া থেকেই বোঝা যায়। দুঃখের বিষয়, আমাদের সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে ভারতের প্রতি জনগণের বিরূপ মনোভাব উপেক্ষা করে তার সমর্থন পাওয়ার আশায় ছুটে যাচ্ছে। তবে ভারত বুঝতে পারছে, আগামী নির্বাচনটি ক্ষমতাসীন দলের জন্য সহজ হবে না এবং জঙ্গী উত্থান, সেনা সরকার গঠিত হতে পারে বলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছে। এটাও বুঝতে পারছে, ক্ষমতাসীন দল তাকে যতই তোষামোদী করুক, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তার প্রতি অত্যন্ত বিরূপ ধারণা পোষণ করে এবং আভ্যন্তরীন বিষয় তার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না। দেখার বিষয় হচ্ছে, ভারত জনগণের এ মনোভাব উপেক্ষা করে পুনরায় একটি বিতর্কিত নির্বাচনে সহায়তা করে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ নেয়, নাকি জনগণের বিরূপ মনোভাবকে প্রাধান্য দিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে। ইনকিলাব
darpan.journalist@gmail.com
Share this:
- Click to share on Facebook (Opens in new window)
- Click to share on Twitter (Opens in new window)
- Click to share on LinkedIn (Opens in new window)
- Click to share on Tumblr (Opens in new window)
- Click to share on Pinterest (Opens in new window)
- Click to share on Pocket (Opens in new window)
- Click to share on Reddit (Opens in new window)
- Click to share on Telegram (Opens in new window)
- Click to share on WhatsApp (Opens in new window)
- Click to print (Opens in new window)
