বিমানবাহিনীর জিপ দুর্ঘটনা : বেবিচকের তদন্ত কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি মাঠে : বেবিচকের পরিবহন বিষয়ক অভিঙ্ঞ মেকানিকদের তদন্তে রাখা হয়নি, রাখা হয়নি কোন সিভিল ইনজিনিয়ার : কমিটিতে কেরানি কেন?

নিউজ ডেক্স : শাহজালালের তয় টার্মিনালে  বিমান বাহিনীর জিপ দুর্ঘটনায় বেবিচকের ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি সভাপতি মো. নজরুর ইসলামের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি মাঠে। কিন্ত বেবিচকের এমটি পুলের পরিবহণ বিষয়ক অভিঙ্ঞ মেকানিক ও গ্রীজার মেহেদী হাসান, সাজেদুল ইসলাম কিংবা  আব্দুল্লাহ আল মামুনকে তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়নি। তাহলে জিপ দুর্ঘটনার আসল কারণ নির্ণয় করবে কে? পরিবহণে কারিগরি ত্রুটি, ব্রেক ফেল ও অন্যান্য  সমস্যাজনিত কারণ নির্ণয়  বিষয়ক অভিঙ্ঘ সংশ্লিষষ্টদের তদন্ত কমিটিতে  রাখা উচিত ছিল বলে এ বিষয়ক অভিঙ্ঞরা মতামত ব্যক্ত করেছেন।

বিশেষ করে যানবাহন দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারিগরি কারণ অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মোটর ট্রান্সপোর্ট (এমটি) বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা যানবাহনপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে রাখা হয়নি। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কতটা নিরপেক্ষ, কারিগরি ও বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে তদন্ত করলে এর প্রকৃত কারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অজানাই থেকে যেতে পারে। গাড়িটির যান্ত্রিক ত্রুটি, ব্রেকিং সিস্টেম, স্টিয়ারিং, টায়ারের অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস এবং দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির সম্ভাব্য গতি-এসব বিষয় পরীক্ষা না করলে তদন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। এখানে যেহেতু সিসি ক্যামেরা রয়েছে, তাই তদন্ত কমিটি বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখবে। তারা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করবে। আমাদের তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত এবং সার্বক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রিত।

আদেশ অনুযায়ী, কমিটির সভাপতি করা হয়েছে এভিয়েশন সিকিউরিটির (এভসেক) উপপরিচালক (ট্রেনিং অ্যান্ড লজিস্টিক) মো. নজরুল ইসলামকে। সদস্যরা হলেন-এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ম্যানেজার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. জাহাঙ্গীর আলম, নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. সাদ্দাম হোসেন, ওয়ারেন্ট অফিসার মো. রশিদুল ইসলাম এবং উচ্চমান সহকারী মো. কামরুল হাসান।

কমিটির পাঁচ সদস্যের কারও দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি যানবাহনের যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টি যুক্ত নয়। এ কারণে দুর্ঘটনার মূল কারণ অনুসন্ধানে কমিটির কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এমটি বিভাগের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা থাকলে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটির যান্ত্রিক পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ নথি যাচাই এবং গাড়ির ত্রুটির সম্ভাব্যতা যাচাই সহজ হতো। যানবাহন প্রকৌশলী বা অটোমোটিভ বিশেষজ্ঞ যুক্ত করা হলে ব্রেক, স্টিয়ারিং, সাসপেনশন, টায়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের কারিগরি বিশ্লেষণও সম্ভব হতো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যানবাহন দুর্ঘটনার তদন্তে প্রথমেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন দুর্ঘটনার আগে গাড়িটির অবস্থা কেমন ছিল। পিকআপটির ব্রেক ঠিকমতো কাজ করছিল কি না, ব্রেক ফেল বা ব্রেক-সংক্রান্ত কোনো ত্রুটি ছিল কি না, স্টিয়ারিংয়ে সমস্যা ছিল কি না, টায়ারের ক্ষয় বা চাপ স্বাভাবিক ছিল কি না-এসব বিষয় কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে গাড়িটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল কি না এবং সর্বশেষ কবে সেটি পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেই তথ্যও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার সময় গাড়িটির গতি কত ছিল এবং চালক কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারালেন, এ প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট উত্তর প্রয়োজন। এজন্য ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির ধরন, ব্রেকের দাগ, রাস্তার পৃষ্ঠ, বাঁক, ঢাল এবং গাড়িটির গতিপথ বিশ্লেষণ করা দরকার। এসব তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলেই দুর্ঘটনার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটিতে সরাসরি কারিগরি বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা কোনো বিশেষজ্ঞ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে।

অবকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন : দুর্ঘটনাস্থলের অবকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তৃতীয় টার্মিনালের ড্রাইভওয়ে থেকে একটি পিকআপভ্যান কীভাবে নিচে পড়ে গেল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সড়কের নকশা, বাঁক, ঢাল, গার্ডরেল বা সুরক্ষাবেষ্টনীর অবস্থান, রাস্তার প্রস্থ, দৃশ্যমানতা এবং পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল কি না-এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো যানবাহন সড়ক থেকে ছিটকে নিচে পড়ে গেলে শুধু চালকের ভুলকে দায়ী করার আগে পর্যায়ক্রমে কয়েকটি বিষয় যাচাই করতে হয়। গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি, চালকের দৃষ্টিসীমা ও সড়কের অবস্থা, সড়কের নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা, গাড়ির গতি এবং দুর্ঘটনার আগে গাড়িতে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিয়েছিল কি না-এসব বিষয় যাচাই জরুরি।

দুর্ঘটনাস্থলের সড়কের বাঁক, অবকাঠামোগত অবস্থা ও সড়কে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা যাচাইয়ে কমিটিতে একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকেও রাখা দরকার। এখনো সুযোগ থাকলে মোটর পরিবহণসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে কমিটিতে যুক্ত করা হলে তদন্ত আরও কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ হবে বলে অভিঙ্ঞরা  মন্তব্য করেন ।

দুর্ঘটনার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। এতে গাড়িটির গতিপথ, গতি, চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর মুহূর্ত এবং অন্য কোনো যানবাহন বা প্রতিবন্ধকতার উপস্থিতি বিশ্লেষণ করা সম্ভব। পাশাপাশি গাড়িটি উদ্ধারের পর ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার, অ্যাক্সেল, সাসপেনশন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব পরীক্ষার ফল তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্ত না হলে দুর্ঘটনার কারিগরি কারণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যেতে পারে।

সোমবার রাত সোয়া ১০টায় তৃতীয় টার্মিনালের ভেতরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকালে বিমানবাহিনীর সদস্যদের বহনকারী পিকআপভ্যানটি দ্বিতীয় তলা থেকে নিচে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই বিমানবাহিনীর তিন সদস্য-ওয়ারেন্ট অফিসার মাহমুদ, কর্পোরাল মনিরুজ্জামান ও ল্যান্স কর্পোরাল জুবাইদুল নিহত হন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত কর্পোরাল মাহবুব ও এলএসি আহাদসহ চারজন বর্তমানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন।

বিমানবাহিনীর নিহত তিন সদস্যের ফিউনারেল প্যারেড অনুষ্ঠিত : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে সড়ক দুর্ঘটনায় বিমানবাহিনীর নিহত তিন সদস্যের জানাজা ও ফিউনারেল প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরা হলেন-ওয়ারেন্ট অফিসার সুলতান মাহমুদ, কর্পোরাল মনিরুজ্জামান পিয়াস ও এলএসি মো. জুবাইদুল ইসলাম। মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৫টায় ঢাকা সেনানিবাসস্থ বিমানবাহিনী ঘাঁটি বীর উত্তম এ কে খন্দকার (কুর্মিটোলা) এর সি-১৩০ হ্যাঙ্গারে সামরিক মর্যাদায় মরহুমদের জানাজা ও ফিউনারেল প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ?্য জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।