একুশে বার্ত ডেক্স : অবশেষে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভিভিআইপি কেবিনে নেয়া হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন থেকে এখানে রেখেই চিকিৎসা দেয়া হবে তাকে। তাকে রাখা ভিভিআইপি ‘কেবিন নাম্বার ৬১১’।
আজ শনিবার বেলা সোয়া ৩টার দিকে খালেদা জিয়াকে নিয়ে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাদা রঙের গাড়ি। এর সামনে-পেছনে ছিল পুলিশ, র্যাবের বেশ কয়েকটি গাড়ি। একটি অ্যাম্বুলেন্সও ছিল গাড়িবহরে। বকশি বাজার থেকে বের হয়ে শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট ক্রসিং, মৎস্যভবন হয়ে আধা ঘণ্টা পর পৌনে ৪টার দিকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে পৌঁছে গাড়িটি। গোলাপি রঙের শাড়ি ও কালো রঙের রোদ চশমা পরা খালেদা জিয়া গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে ওঠেন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালের কেবিন ব্লকের ছয় তলায়। কারাগারে থাকা খালেদার গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকেও গাড়ি থেকে নেমে হাসপাতালে উঠতে দেখা যায়। কয়েকটি ব্যাগও এসময় নামানো হয় গাড়ি থেকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. অধ্যাপক জলিলুর রহমান চৌধুরীর অধীনে ৬১১ নম্বর ভিভিআইপি কেবিনে তাকে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ডও পুনর্গঠন করা হয়েছে। তাতে আগের মেডিকেল বোর্ডের পাঁচ সদস্যের মধ্যে দু’জন রয়েছেন এই বোর্ডে, নতুন স্থান পেয়েছেন তিন জন।
বিএসএমএমইউ সূত্রে জানা গেছে, আগের মেডিকেল বোর্ডের দুই সদস্য অধ্যাপক ডা. অধ্যাপক জলিলুর রহমান চৌধুরী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বদরুন্নেসার সঙ্গে এই মেডিকেল বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা বাকি তিন চিকিৎসক হলেন— বিএসএমএমইউ কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক সজল ব্যানার্জি, রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক ও অর্থোপেডিক বিভাগের অধ্যাপক নকুল কুমার দত্ত।
খালেদা জিয়াকে ভর্তির পর এক ব্রিফিংয়ে বিএসএমএমইউ পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুন বলেন, খালেদা জিয়া যেহেতু একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাই তার নিরাপত্তার জন্য সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জেল কোড অনুসারে তার সঙ্গে যারা থাকার দরকার তারাই হাসপাতালে থাকবেন। আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছি যাতে তার কোনো অসুবিধা না হয়।
পরিচালক বলেন, খালেদা জিয়া আজকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমাদের সঙ্গে তিনি কুশল বিনিময় করেছেন। তার চিকিৎসার দরকারি সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রোববার দুপুর ১টার পর মেডিকেল বোর্ডের বৈঠক শেষে বলা যাবে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা সম্পর্কে। ওই বৈঠক থেকেই তার চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন চিকিৎসকরা। শনিবার যেসব ফর্মালিটি করার দরকার ছিল মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা সেটি করেছেন।
খালেদা জিয়ার পছন্দের চিকিৎসক মেডিকেল বোর্ডে আছেন কি না জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, আদালতের নির্দেশে আবদুল জলিল চৌধুরী ও ডা. বদরুন্নেসাসহ পাঁচজন ডাক্তারের মেডিকেল বোর্ড আমরা গঠন করেছি। আদালত আদেশে বলেছেন, এখানে ভর্তি হওয়ার পর আমরা সেই অনুসারে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছি। এর পরও যদি তার নিজস্ব কোনো পছন্দের ডাক্তার থাকেন উনি বলার সঙ্গে সঙ্গে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ৬১১ নম্বর ভিভিআইপি কেবিনে থাকবেন খালেদা জিয়া। এর পাশের ৬১২ নম্বর কেবিনটিতে থাকবেন কারাকর্তৃক্ষের প্রতিনিধিরা।
বিকালে খালেদাকে আনার আগে দুপুরে তার ব্যবহৃত কাপড়, ব্যাগ, বালতিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হাসপাতালে আনা হয়। ৬১১ নম্বর ভিভিআইপি কেবিনে একটি টেলিভিশন, একটি ফ্রিজ, একটি বক্স টেবিল, ছোট দুইটি সোফা সেট এবং একটি বক্স খাট রাখা রয়েছে। এছাড়া রুমের ভেতরে কলিং বেল রয়েছে যাতে করে রোগী প্রয়োজন হলে নার্স বা অন্য কাউকে ডাকতে পারবেন।
এর আগে খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে নেয়া হবে এমন সংবাদ পাওয়ার পর ৬১১ ও ৬১২ কেবিনটি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়। বিএসএমএমইউয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খালেদা জিয়া আসবেন বলে হাসপাতালের সবগুলো সিসি ক্যামেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এছাড়া কেবিন দুটির আশপাশে নতুন কয়েকটি সিসি ক্যামেরাও লাগানো হয়েছে।
এদিকে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী এ সময় উপস্থিত ছিলেন হাসপাতাল প্রাঙ্গণে; তবে পুলিশের বাধার কারণে তারা দলীয় নেত্রীর কাছে যেতে পারেননি। পুলিশের বাধায় আটকে বৃষ্টির মধ্যে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে খালেদার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেন মহিলা দলের নেতা-কর্মীরা। এ ছাড়া ছিলেন ছাত্রদল, যুবদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
হাসপাতালের ভেতরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন, ডা. এজেডএস জাহিদ হোসেন, নিতাই রায় চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, খায়রুল কবির খোকন, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানা উল্লাহ মিয়া, নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজিম উদ্দিন আলম, আবু নাসের মো. রহমাতুল্লাহ, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, চেয়ারপার্সনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খানসহ দলটির প্রায় শতাধিক নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তবে মির্জা আব্বাস ও আফরোজা আব্বাসকে বিএসএমএমইউ’র মূল ফটকে থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তারা বেগম জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যাপারে আশাবাদী।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, আমরা কারাগার থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিয়ে তাকে নিয়ে এসেছি। শাহবাগে কোটা বহালের দাবিতে আন্দোলন ছিল। এগুলোকে অগ্রাহ্য করেই তাকে নিয়ে এসেছি। কোনো সমস্যা হয়নি।
হাসপাতালে খালেদা জিয়ার নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা থাকবে, নেতা-কর্মীদের দেখা করতে দেয়া হবে কি না- এমন প্রশ্নে পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কারাবন্দীদের সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে একটা নিয়ম আছে। এর বাইরে কেউ দেখা করতে পারবে না। আর এখানে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। গোয়েন্দারাও থাকবেন।
এর আগে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন জানিয়েছিলেন, আজই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বিএসএমএমইউতে স্থানান্তর করা হবে।
খালেদাকে হাসপাতালে আনার আগে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের বাইরে দুপুর থেকে পুলিশের তৎপরতা দেখা যায়। কারা ফটকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ছিল তখন। র্যাবের গাড়িকেও দেখা যায় ঘন ঘন টহল দিতে।
কারাগার সংলগ্ন মাক্কুশা মাজারের সামনে, বকশীবাজার মোড়ে পুলিশ অবস্থান নিয়ে গাড়ি চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। এরপর সোয়া ৩টার দিকে খালেদাকে নিয়ে বেরিয়ে আসে পুলিশের গাড়িটি।
আট মাস ধরে কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে গত এপ্রিল মাসে একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এই বিএসএমএমইউতে আনা হয়েছিল। এরপর আর কারাগার থেকে বের হননি তিনি। মাঝে একদিন জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট মামলার শুনানিতে হাজির হলেও ওই আদালত বসেছিল কারাগারেরই ভেতরে। জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় গত ফেব্রুয়ারিতে রায়ের পর থেকে পরিত্যক্ত ওই কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে দিন কাটছিল খালেদার।
চিকিৎসার জন্য তাকে বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়ার দাবি তুলেছিল বিএনপি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তাকে বিএসএমএমইউ কিংবা সিএমএইচে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তিন মাস আগে একবার তাকে একবার বিএসএমএমইউতে নেওয়ার চেষ্টা কারা কর্তৃপক্ষ করলেও তাতে রাজি হননি খালেদা।
এতদিন প্রত্যাখ্যান করে আসা বিএনপির সরে আসার বিষয়ে খালেদার অন্যতম আইনজীবী ও দলের যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবউদ্দিন খোকন গত বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, ম্যাডামের অবস্থা খুবই খারাপ। আদালত দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আদেশ দিয়েছেন।
চিকিৎসা নিয়ে সরকারের ভাষায় ‘বিএনপির রাজনীতি’র পর সম্প্রতি খালেদার পক্ষে তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষ বোর্ড গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাই কোর্টে আবেদন হয়েছিল। ওই আবেদনে বৃহস্পতিবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাই কোর্ট বেঞ্চ দ্রুত ঢাকার বিএসএমএমইউতে খালেদাকে ভর্তি এবং তার চিকিৎসায় গঠিত পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয়।
খালেদার অসুস্থতার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল বলেছিলেন, তার বাঁ হাত ও বাঁ পা প্রায় অবশ হয়ে গেছে। অসহ্য ব্যথা অনুভব করছেন।
গত ৫ জুন খালেদার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’হয়েছিল বলেও তাকে দেখে এসে নিজের ধারণার কথা জানিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক মেডিসিনের অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী। এরপর সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ড জানায়, খালেদা অসুস্থ হলেও তার অবস্থা গুরুতর নয়।
তাদের ভাষ্য, অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার আগে থেকেই রিউম্যাটয়েডআর্থ্রাইটিস (গেঁটে বাত) রয়েছে। সে কারণে দুই হাতে ও পিঠে ব্যথা অনুভব করেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে তার হৃদযন্ত্র, রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।
একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এক্ষেত্রে তাদের কিছু করার নেই। জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় জামিন হলেও অন্য মামলায় খালেদাকে আটকে রাখার পেছনে সরকারের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ বিএনপির।
