গুলশানে হলি আটিজানে জংগি হামলা : ৭৫২ দিন পর মামলার চার্জশীট

একুশে বার্তা ডেক্স : অবশেষে  দীর্ঘ ৭৫২ দিন পর তদন্ত শেষে আলোচিত গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় জঙ্গী হামলার চার্জশীট  দিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। আদালতে দাখিল করা চার্জশীটে ২১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাওয়ার কথা উল্লেখ করে জীবিত ৮ জনের নামে চার্জশীট দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ বাহিনীর থান্ডার বোল্ট অপারেশনে জঙ্গী হামলার সময়ে ঘটনাস্থলেই ৫ জন নিহত এবং মামলা তদন্তনাধীনকালে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৮ জনসহ নিহত ১৩ জনকে চার্জশীট থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। যে ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট দেয়া হয়েছে তার মধ্যে ৬ জন আটক ২ জন পলাতক রয়েছে। চার্জশীটে ৭৫ আলামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা আদালতে পাঠানো হয়েছে। চার্জশীটে মোট সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে ২১১ জনের। এর মধ্যে ১৪৯ জন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এর বাইরে বিভিন্ন সংস্থার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অফিসার, ফরেনসিক টেস্ট যারা করেছেন, তাদের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। এ মামলায় গ্রেফতার হওয়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমের সম্পৃক্ততা পায়নি উল্লেখ করে চার্জশীট থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে তাকে।

দেশকে অস্থিতিশীল করে জঙ্গী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করে সরকারকে কোণঠাসা করার মাধ্যমে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য বিদেশী ক্রেতারা ফিরে যাওয়ার জন্য হলি আর্টিজান জঙ্গী হামলা চালানো হয় বলে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটপ্রধান মনিরুল ইসলামের দাবি। চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়, হলি আর্টিজানে জঙ্গী হামলায় সরাসরি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি, কিন্তু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী থেকে প্রযুক্তিগত সুবিধা পেতে এই জঙ্গী হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্য ছিল এ হামলার উদ্দেশ্য।

২৩ জুলাই সোমবার ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গী হামলাকারীরা ৬ মাস আগে থেকে বিভিন্ন জায়গায় রেকি করে হলি আর্টিজান জঙ্গী হামলার পরিকল্পনা করে। তদন্ত প্রতিবেদনে চিহ্নিত ২১ জনের মধ্যে ৫ জন সরাসরি হামলায় অংশ নেন। বাকিরা হামলার পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) তামিম চৌধুরী, মূল প্রশিক্ষক (মাস্টার ট্রেনার) মেজর জাহিদ কিংবা তানভির কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসামি। গুলশান হামলার জন্য বগুড়ার দুই জঙ্গীকে নিয়োগ করেন রাজীব আর বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া ও জঙ্গীদের উদ্বুদ্ধও করেন তিনি। হাদিসুর রহমান সাগর সীমান্তের ওপার থকে আসা অস্ত্র ঢাকায় মারজানের কাছে পৌঁছায়। বাশারুজ্জামান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফা হুন্ডির মাধ্যমে আসা ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এবং সেই টাকা হামলায় ব্যবহৃত হয়। হলি আর্টিজানে প্রচুর বিদেশী নাগরিক খাওয়াদাওয়া করতে আসতেন। এখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রায় ছিলই না। তাই এই রেস্টুরেন্টকে তারা বেছে নেয়। এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া যায় সহজে। এ ছাড়া সে দিন ছিল শুক্রবার, ২৭ রমজান, বেশি সওয়াব পেতে তারা ওই দিন হামলা চালায়। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এ ঘটনায় হাসনাত করিম, সাইফুল চৌকিদার ও শাওনের জড়িত থাকার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। যারা পালিয়ে আছেন, তাদের গ্রেফতারের বিষয়ে আদালতে ওয়ারেন্ট ইস্যু করার দাবি জানানো হয়েছে। হলি আর্টিজানে হামলার সময়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত হন ৫ জন। এরা রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। দীর্ঘ দুই বছরাধিকালের তদন্তের বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৮ জন। তারা হলেন তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকোলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান। জীবিত আটজনের মধ্যে ৬ জন কারাগারে আটক। তারা হলেন রাজীব গান্ধী, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাতকাটা সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা। এ মামলায় পলাতক ২ আসামি হচ্ছে শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন। তিনি বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, আসামিরা ৫ মাস আগে থেকেই হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করা, বাংলাদেশকে একটি জঙ্গী রাষ্ট্র বানানো, সরকারকে চাপের মুখে ফেলা। সোমবার সকালে মিন্টো রোডে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা ওই অভিযোগপত্র আদালতে পাঠিয়েছেন।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজানে জঙ্গীরা হামলা চালায়। তারা অস্ত্রের মুখে দেশী-বিদেশী অতিথিদের জিম্মি করে। ওই রাতে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে ৫ জঙ্গীসহ ৬ জন নিহত হয়। পরে পুলিশ ১৮ বিদেশীসহ ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হলি আর্টিজানের একজন বেকারিকর্মী।

যেভাবে জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটে : ২০১৬ সালের ১ জুলাই, শুক্রবার। রাত প্রায় পৌনে নয়টা। গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে স্প্যানিশ রেস্তরাঁ হলি আর্টিজানে কয়েক যুবক অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় গুলিও ছোড়ে তারা। তখন সেখানে পুলিশ গেলে তাদের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের ঘটনা ঘটে। গুলি বিনিময়ের শুরুতেই গুলিতে প্রদীপ ও আলমগীর নামের পুলিশের দুজন কনস্টেবল ও আবদুর রাজ্জাক নামের এক পথচারী আহত হন। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ওই এলাকা ঘেরাও করে ফেলে। তখন রাত ১০টা। গুলি-বোমায় আহত হয় পুলিশ সদস্যরা। হলি আর্টিজানের ভেতর থেকে একের পর এক গুলি ও বোমার আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে। রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে ভেতর থেকে অস্ত্রধারীরা পরপর দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় এবং কয়েকটি গুলি ছোড়ে। এ সময় চারদিকে ঘিরে থাকা র‌্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে যান। বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিনসহ আহত কয়েক পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়। রাত প্রায় ১১টায়, আইএসের দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রকাশ করে। আর্টিজানে হামলাকারী উল্লেখ করে শুক্রবার রাত দেড়টায় পাঁচ তরুণের ছবি প্রকাশ করে জঙ্গীগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। জঙ্গীগোষ্ঠীর ইন্টারনেট ভিত্তিক তৎপরতা নজরদারিতে যুক্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এ তথ্য প্রকাশ করে। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জঙ্গীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। এ সময় ঘটনাস্থলে আসেন র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। তিনি সাংবাদিকদের জানান, আর্টিজানের ভেতরে অন্তত ২০ বিদেশীসহ কয়েক বাংলাদেশীও আটকা পড়েছে। ভেতরে যারা আছেন, তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য তারা বিপথগামীদের সঙ্গে কথা বলতে চান। সেই সঙ্গে অভিযানের ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার না করার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির পাশাপাশি রাতেই সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর কমান্ডোরা অভিযানে অংশ নেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সম্মিলিতভাবে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের পাশ থেকে গণমাধ্যমকর্মীসহ সাধারণ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে দেয়া হয়। এরই মধ্যে খবর প্রচার হয় শুক্রবার রাতেই ২০ জনকে হত্যা করা হয়। নিহত ২০ জনের মধ্যে নয়জন ইতালির নাগরিক, সাতজন জাপানের ও একজন ভারতের নাগরিক। বাকি তিনজন বাংলাদেশী। পরের দিন ২ জুলাই শনিবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে অভিযানের শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এয়ার কমান্ডোর নেতৃত্বে এ অভিযান থান্ডার বোল্ট। মাত্র ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যেই সব জঙ্গীদের নির্মূল করে ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অভিযানের মাধ্যমে একজন জাপানী, দুজন শ্রীলঙ্কানসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করার সাফল্য অর্জিত হয়। হামলাকারীরা ঘটনাস্থলেই নিহত হয় এবং এক সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়। হলি আর্টিজানে ১২ ঘণ্টার এই জিম্মি ঘটনায় ২০ জিম্মি, ছয় সন্ত্রাসী, দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২৮ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ২০ পুলিশ সদস্য। শ্বাসরুদ্ধ কর পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফিরে আসে গোটা দেশে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও শোক দিবস : অভিযান শেষে ২ জুলাই শনিবার, রাত পৌনে ৮টায় রেডিও ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। ৩ জুলাই ও ৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় শোকের দিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও জনগণকে কালো ব্যাজ ধারণ করতে বলা হয়। এ ছাড়া মসজিদে মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনা করার কথা জানানো হয়। সেই সঙ্গে জঙ্গীদের নির্মূল করে বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যেভাবে ২১ জনের সম্পৃক্ততা ॥ জঙ্গী হামলায় জড়িত ২১ জনের মধ্যে কমান্ডো অভিযানে নিহত পাঁচ ছাড়াও আরও আট জন বিভিন্ন সময় পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে মারা গেছে। গ্রেফতার হয়ে ছয় জঙ্গী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। এখনও দুই জঙ্গী পলাতক রয়েছে।

হামলার আগে অস্ত্র ও বোমা নিয়ে ওই বাসা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল পাঁচ জঙ্গী। হামলাকারী জঙ্গীরা যাওয়ার পর তিনি তার স্ত্রী ও সন্তান, তামিম চৌধুরী, মারজান ও রাজীব গান্ধী ওই বাসা ছেড়ে চলে যান। ডাচ বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা থাকাকালীন সময়ে জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি।