একুশে বার্তা ডেক্স : ১৩ কেজি সোনা পাচারে ধরা গেলেও সিভিল এভিঢয়শনের দুই নিরাপত্তাকর্মী মাহবুব ও তার আপন ভাগিনা তৌহিদকে সাসপেন্ড করেনি সিএএবির প্রশাসন। তবে এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ দিকে নিরাপত্তা কর্মী মাহবুবের আপন বোন এবং তৌহিদের মা সিএএবির উপনিরাপত্তা কর্মকতর্কা সেলিনা এখনও ধরাছোয়ার বাইরে।
গত ৮ মে মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগমনী হলের ৮ নম্বর বেল্টের কাছ থেকে সিভিল এভিয়েশনের (সিএএবি) বেল্ট অপারেটর মো. ইলিয়াস উদ্দিনকে আটক করে ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেনটিভ টিম। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে লুকানো অবস্থায় দেড় কেজি ওজনের ১০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়।
সিএএবির শুধু ইলিয়াস , মাহবুব, তৌহিদ, রেজাউল, তালেবরাই নয়- আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানকারী চক্রের সঙ্গে এখন জড়িয়ে পড়ছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ালাইনস ও সিভিল এভিয়েশনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই তালিকায় সুইপার-ঝাড়–দার-ড্রাইভার থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত। স্বর্ণ ছাড়াও ইয়াবাসহ নানা পণ্য পাচারের সঙ্গেও জড়িত তারা। বিমানের শাহজালাল ভবন ক্লিনিং ইজারাদার সংশ্লিষ্ট দুলাল ও ১৭ ক্লিনারও বছরের পর বছর ধরে চোরাচালান চক্রের সদস্য হিসেবে কাজ করছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় চালিয়ে যাচ্ছেন এসব অপকর্ম। কালেভদ্রে দু-একজন ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নজির হাতেগোনা। কেউ কেউ জেল খেটে এসে আবার স্বপদে বহাল হয়ে পুরনো কজে নেমে পড়ছে।।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হাতেনাতে স্বর্ণ ও বিভিন্ন অবৈধ পণ্যসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ লিখিত অভিযোগের দোহাই দিয়ে কালক্ষেপণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, স্বর্ণ পাচারে সিভিল এভিয়েশন ও বিমানের কর্মীরা জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি আমাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। এই দুই সংস্থার কোনো কর্মী স্বর্ণসহ আটকের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু কী কারণে তারা ব্যবস্থা নেয় না, তা তারাই বলতে পারবেন। বিষয়টি খুবই রহস্যজনক।
সম্প্রতি বিপুল পরিমাণে স্বর্ণসহ গ্রেপ্তার হয় বিমানের মাইক্রোবাস চালক বিল্লাল হোসেন, ফ্লাইট ক্যাটারিং সার্ভিসের প্যানট্রিম্যান (বিএফসিসি) মো. ইফতেখারুল ইসলাম, শাহিনুর ইসলাম ও খন্দকার রুহুল আমিন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী জাফর ইকবাল ও জয়দেব দাস। তাদের বিরুদ্ধেও দৃশ্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, দেশি-বিদেশি একাধিক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে স্বর্ণ পাচার। শুধু রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই নয়, চট্টগ্রামের শাহ আমানত এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও রয়েছে পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশ বিমান ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং একাধিক রাজনৈতিক নেতা এই নেটওয়ার্কের সদস্য। আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা বাংলাদেশিদের সঙ্গে আঁতাত করে তারা স্বর্ণ পাচার করে আসছে।
গত ২৭ এপ্রিল উত্তরার একটি বাসা থেকে সাত কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ১৩ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে র্যাব। এ সময় স্বর্ণ চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত কাজী মাহবুবুর রহমান এবং স্বর্ণের ক্যারিয়ার মির্জা জাকির হোসেনকে আটক করা হয়। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, এই স্বর্ণ পাচারের সঙ্গে জড়িত সিএবির নিরাপত্তাকর্মী তৌহিদুল ও মাহবুব আলম। ২৮ এপ্রিল রাতে এই দুজনকেও গ্রেপ্তার করেন র্যাব সদস্যরা। কিন্তু অদ্যাবধি অবধি সিএবির কর্মচারী তৌহিদুল ও মাহবুবের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি সিএবি কর্তৃপক্ষ। মাবুবের বোন ও তৌহিদের মা সিএএবির উপ-নিরাপত্তা কর্মকর্তা সেলিনা এখনও ধরাছোয়ার বাইরে।
গত ২৬ এপ্রিল জুতার ভেতরে করে পাঁচটি সোনার বার পাচারকালে সৌদি আরবের রিয়াদে গ্রেপ্তার হন বিমানের ফ্লাইট স্টুয়ার্ট তোফায়েল আহমেদ। সেখানে এক দিন জেল খাটার পর ২৫ হাজার রিয়াল (বাংলাদেশি প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা) জরিমানা দিয়ে মুক্ত হন তিনি। ফিরে এসে যোগ দেন কর্মক্ষেত্রে। গতকাল অবধি তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বিমানের প্রশাসন শাখা।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রিয়াদের হোটেল র্যাডিসন ব্লুতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণে ইয়াবাসহ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রু রহিত ও শিশিরকে গ্রেপ্তার করেন দেশটির মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা। ওই ঘটনায় রহিত এখনো সৌদি আরবের কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু দেশে ফিরে এসে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন শিশির। তার বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এমনকি বিষয়টি তদন্তে বিমান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো কমিটি গঠন হয়নি; অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা, তা-ও যাচাই করা হয়নি।
শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের প্রধান দুই বিমানবন্দর ঘিরে দেশি-বিদেশি ১০টি প্রভাবশালী স্বর্ণ চোরাচালানি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার শাহজালালে ৬টি, চট্টগ্রাম শাহ আমানতে ৩টি ও সিলেটে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। এই চক্রের সদস্যদের মধ্যে ৭জন স্বর্ণ এবং ৩জন মানি এক্সচেঞ্জ চোরাচালান ব্যবসা করেন। পাশাপাশি তাদের সহযোগিতায় রয়েছে বাংলাদেশ বিমানের বিভিন্ন পর্যায়ের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা। এসব চক্রের মূলহোতারা সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন দুবাই। চট্টগ্রামে ১২ জনের একটি চক্র স্বর্ণ চোরাচালানের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে তদারক করেন।
