শাহজালালে ময়লার ভিতর ৫০ কোটি টাকার আড়াই মণ সোনা জব্দ : গোয়েন্দা নজরদারিতে ময়লা অপসারনকারি প্রতিষ্ঠান সিপিডিএল : উল্টোরথে সিএএবি, দ্বৈত প্রশাসন!

একুশে বার্তা প্রতিবেদন : উল্টোরথে চলছে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। আগে যেখানে সিএএবি কর্তৃপক্ষ নিজস্ব টাকা খরচ করে শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশের অন্য ২টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও অন্যান্য বিমানবন্দরের বর্জ বা  ময়লা পরিষ্কার বা অপসারন করাতো এখান উল্টোরথে সিএএবির প্রশাসন ঠিকাদারদের থেকে বছরে  লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে ময়লা অপসারন করাচ্ছে। এতে করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দিন দিন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই অনৈতিক কাজের সাথে সিএএবির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা- কর্মচারি জড়িয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যেই এই অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজনসহ সিএএবির কয়েকজন কর্মচারিকে গ্রেফতার করেছে আইন প্রয়োগকারি সংস্থা। জব্দ  করা হয়েছে ৫০ কোটি মূল্যের  আড়াই মণ সোনা। সিএএবি কর্তৃপক্ষ এই উল্টোরথের ময়লা অপসারন কাজের টেন্ডার আহবানে সংশোধন আনেনি বা নীতিমালা সংশোধন করেনি। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। বিষয়টি সিএএবির এ্যারো/এটিএস বিভাগের একজন পরিচালক স্বীকারও করেছেন। তবে সিলেট ও শাহ আমানত বিমানবন্দরে ব্যবস্থাপকদ্বয় স্বীকার করেছেন তারা নিজস্ব উদ্যোগে সিএএবির টাকা ঠিকাদারকে দিয়ে বিমানবন্দরের ময়লা অপসারন করছেন।কিন্ত শাহজালালে উল্টো নিয়ম চলছে। এ যেন একই সংস্থায় দ্বৈত প্রশাসন চলছে!

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ময়লা-আবর্জনা তথা গারবেজ (উচ্ছিষ্ট বর্জ্য) দিন দিন মূল্যবান হয়ে উঠছে। একসময় সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের (সিএবি) নিয়োগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে সব ধরনের বর্জ্য অপসারণ (ক্লিনিং) করত। এখন সেই বর্জ্য অপসারণে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে উল্টো অর্থ দেওয়া হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে- কী মধু আছে এই বর্জ্য। এ ছাড়াও বর্জ্য অপসারণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর স্থানে চলাচলের কারণে হুমকিতে রয়েছে বিমানবন্দরের  নিরাপত্তাও।

দেশের অপর ২ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর- চট্টগ্রাম শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের ময়লা-আবর্জনা অপসারণের কাজ নিজস্ব জনবল দিয়ে করা হয়ে থাকে। জনবলের পেছনে প্রতিমাসে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের বেতনভাতাও।

সূত্র জানায়, ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে বিমানবন্দরের শৌচাগার, ময়লার ঝুড়ি এবং কার্গো গুদামের আবর্জনার স্তূপ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা মূল্যের ৯৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করে শুল্ক বিভাগ । সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ গভীর রাতে শাহজালাল বিমানবন্দরের ময়লা-আবর্জনা রাখার ঝুড়ি থেকে দেড় কোটি টাকা মূল্যের ৩ কেজি ওজনের ৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়। এই চালানের ময়লার ঝুড়ির বর্জ্যরে সঙ্গে পাচার করার পরিকল্পনা ছিল।

এর আগে ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরের বর্জ্য থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এই স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাবেক ক্লিনিং প্রতিষ্ঠান ‘নাহিদ ট্রেডার্সে’র কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির  ম্যানেজার নুরুল ইসলামকে এক মাসের কারাদন্ড ও জরিমানা করেন বিমানবন্দর  আদালত।

সূত্র জানায়,  কয়েক বছর আগে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে বছরে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বর্জ্য অপসারণ করত নাহিদ ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তখন দৈনিক যে পরিমাণ বর্জ্য হতো, এখন পরিমাণ সামান্য বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে টাকাও কয়েকগুণ। শাহজালাল বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণে সিএবিকে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে মাস কয়েক আগে কাজ নিয়েছে ক্রাউন প্রপার্টিজ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিডিএল) নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের মালিক আলম হায়দার মিঠু। গত বছর ১ আগস্ট থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ করছে সিপিডিএল। এরই মধ্যে এর কর্মীদের বিরুদ্ধেও উঠতে শুরু করেছে নানা অভিযোগ। গত ১৭ এপ্রিল শাহজালাল বিমানবন্দরে অবৈধ পাস নিয়ে সন্দেহজনক ঘোরাফেরার সময় আটক করা  হয় সিপিডিএলের কর্মকর্তা জুবায়েরকে। তাকে ৭ দিনের কারাদনন্ড দেন বিমানবন্দর  আদালত। গত ৯ এপ্রিল বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকায় অনুপ্রবেশের দায়ে গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক হন প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার আবু তালেব বাবু ও সুপারভাইজার আজিজুর রহমান। সিপিডিএল ক্লিনিংয়ের কাজ নেওয়ার পর রেকর্ডসংখ্যক স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে বিমানবন্দরের বর্জ্য ও বর্জ্য রাখার পাত্র, এমনকি শৌচাগার থেকেও। কেন বর্জ্যরে ভেতর থেকে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে গেল, তা নিয়েও রহস্য ও প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান,  সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষকে টাকা দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণ করছে বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। ময়লা পরিষ্কার করার জন্য যেখানে টাকা পাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো টাকা পরিশোধ করে বর্জ্য অপসারণ করার বিষয়টি রহস্যজনক। বিভিন্ন সময় আমরা বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজের শৌচাগার, ময়লার ঝুড়ি, ট্রলির নিচে বা কার্গো গুদামের উচ্ছিষ্ট থেকে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ, মাদকদ্রব্যসহ নানা ধরনের পণ্য উদ্ধার করেছি। বর্জ্য ও বর্জ্য রাখার পাত্র থেকে এসব সোনার চালান জব্দ করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, সোনা চোরাচালানসহ নানা অপকর্মে বিমানবন্দরে কর্মরত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য অপসারণকারীরা (ক্লিনার) জড়িত। ফলে ময়লার সঙ্গে স্বর্ণসহ মূল্যবান কোনো কিছু সরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বর্জ্য অপসারণকারী প্রতিষ্ঠান কী স্বার্থে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে বর্জ্য নিচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হবে। এখন থেকে তাদের কার্যক্রমও গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবে বলে জানান তিনি।

বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, বিমানবন্দরের ভেতরে বারবার স্বর্ণের চালান ধরা পড়ায় কৌশল পাল্টেছে চোরাকারবারিরা। ভেতর থেকে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই ময়লার গাড়ি বের করার সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণের নামে গারবেজ অপসারণ প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা স্বর্ণ পাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়াটা অস্বাভাবিক কিছু না।

শাহজালাল বিমানবন্দরে অর্থ নিয়ে বর্জ্য অপসারণ করা হলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মানের দেশের অন্য দুটি বিমানবন্দর চলছে ভিন্ন প্রক্রিয়ায়।

সিভিল এভিয়েশনের পরিচালক (এরোয়েটিএস) নুরুল ইসলাম বলেন, ময়লা অপসারণের জন্য উন্মুক্ত টেন্ডার আহ্বান করা হয়। যে প্রতিষ্ঠান সিভিল এভিয়েশনকে সবচেয়ে বেশি টাকা দেবে, আমরা তাদেরই কাজ দেব। এই কাজের আড়ালে তারা যেন কোনো অপকর্ম করতে না পারে এই বিষয়ে আমরা সচেষ্ট রয়েছি।

উল্টোরথে   লাখ লাখ টাকা দিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণের বিষয়ে জানতে চেয়ে  ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে হাইকোর্টে একটি রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান। রিট পিটিশন নম্বর-১১৮১০/১৫। এর পরিপ্র্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের ময়লা নিষ্কাশনের জন্য ইজারাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আহ্বানকৃত খোলা দরপত্র কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে তখন রুলও জারি করেন হাইকোর্ট।  জনস্বার্থে দায়ের করা ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে রুলে বিমানবন্দরের বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য কেন বিশদ নির্দেশনা প্রণয়ন করা হবে না, তা-ও জানতে চান আদালত।

হাইকোর্টে রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খানের মতে সাধারণত টাকা দিয়ে আমরা ময়লা পরিষ্কার করাই। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরের ময়লা পরিষ্কারের জন্য উল্টো টাকা নেওয়া হচ্ছে। বর্জ্য অপসারণকারী প্রতিষ্ঠান যেহেতু টাকা দিয়ে ময়লা অপসারণ করছে, তাই বিনিয়োগ করা টাকা লাভসহ উঠিয়ে আনার চেষ্টা করবেন সংশ্লিষ্টরা। টাকা উঠিয়ে আনতে না পারলে ময়লা দিয়ে ব্যবসার পাশাপাশি তারা যে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করবেন না, তার নিশ্চয়তা আদৌ আছে কি? ময়লা পরিষ্কারের কাজ করতে ৫ লাখ টাকার ইজারার পরিমাণ এখন যদি প্রায় ৪০ টাকা হয়, তা হলে বিষয়টি সত্যিই চিন্তার এবং সন্দেহজনক। তা ছাড়া সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বর্জ্য অপসারণ না করার কারণে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ। এখন পর্যন্ত রিটটি নিষ্পত্তি হয়নি। অচিরেই এ বিষয়টি আদালতের নজরে আনব এবং রিটের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

৫ লাখ থেকে লাফিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরের বর্জ্য অপসারণের কাজ নেওয়ার বিষয়ে সিপিডিএলের ম্যানেজার আবু তালেব বাবু বলেন, ৪০ লাখ নয় এই কাজ পেতে আমাদের ৭০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। গারবেজ থেকে সংগ্রহ করা প্লাস্টিক, কাচজাতীয় দ্রব্যসহ নানা উচ্ছিষ্ট সামগ্রী বিক্রি করে এই টাকা উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই বর্জ্যরে আড়ালে কোনো অবৈধ মালামাল চোরাচালান হয় কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রতিটি বর্জ্য অপসারণের গাড়ি একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও এপিবিএনের সদস্যরা পরীক্ষার পর অনুমতি মিললে তবেই বিমানবন্দর থেকে ময়লার গাড়ি বের হয়।

গত ১৩ মে দুপুরে বিমানবন্দরের রানওয়ের এয়ার সাইট থেকে ট্রাকে করে উড়োজাহাজের বর্জ্য নিয়ে আসা সিপিডিএলের  বর্জ্যরে একটি  ট্রাকটি (ঢাকা মেট্রো-ন ১৭-৫৪-৪৩)  কোনো সংস্থার পরীক্ষা ছাড়াই বিমানবন্দরের ভেতর থেকে বর্জ্য নিয়ে ৮ নং হ্যাংগার গেট দিয়ে বের হয়ে যায়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিপিডিএলের বর্জ্য অপসারণ প্রকল্পের সুপারভাইজার মো. হারুন জানান,  বিমানবন্দরে দিন-রাত তারা ২২ জন কাজ (দিনে ১৮ ও রাতে ৪ জন) করছেন। রানওয়ের এয়ার সাইটে সুপারভাইজার হিসেবে আছেন আনোয়ার হোসেন। বিমানবন্দর ও উড়োজাহাজে জমা হওয়া বর্জ্যগুলো কালো পলিথিনে ভরে প্রথমে জমা করা হয় রানওয়ের পাশে, পরে ৮ নম্বর গেট দিয়ে দুটি বর্জ্যরে ট্রাক বের করে আজিমপুর ও গাবতলীর ডাম্পিংয়ে ফেলা হয়। এর আগে ময়লা থেকে বাছাই করে বিক্রিজাত দ্রব্যগুলো আলাদা করা হয়। পরে সেগুলো বিক্রি করা হয়। ময়লা থেকে সংগ্রহ করা উচ্ছিষ্ট ভাঙাড়ি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা পরিশোধ করা সম্ভব কিনা- এমন প্রশ্নে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে বিমানবন্দরের নির্বাহি ম্যাজিষ্ট্রেট বিমানবন্দর থেকে ময়লা নিয়ে বের হওয়া ময়লার গাড়ি পরিক্ষা করা হয় না বলে মন্তব্য করেন।