একুশে বার্তা ডেক্স : পাসপোর্ট জমা দেওয়ার সঙ্গে নাগরিকত্ব থাকা বা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক। গত ২৩ এপ্রিল সোমবার বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
শাহদীন মালিক বলেন, দূতাবাসে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ক্ষেত্রে কী হয়েছে, তা স্পষ্ট করা দরকার।
তারেক রহমান পাসপোর্ট জমা দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে দিয়েছেন-পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন বিতর্ক চলছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে গত সোমবার তারেক রহমানের পক্ষে বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক কায়সার কামাল আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। পরে এ বিষয়ে গত সোমবরই সংবাদ সম্মেলন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
যমুনা টিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহদীন মালিক বলেন, ‘পাসপোর্ট থাকা বা না থাকা, জমা দেওয়া বা না দেওয়া তার সাথে নাগরিকত্বের কোনো সম্পর্ক নাই। বাংলাদেশে ১৬ কোটি নাগরিক আছে, তার মধ্যে তো ১৬ কোটি লোকের সবার পাসপোর্ট নাই। যে কোটি কোটি নাগরিক আছে বাংলাদেশে, যাদের পাসপোর্ট নাই, তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক নয়?’
এই আইনজীবী বলেন, ‘জানা বোঝার কিছু সমস্যা আছে বলে এই কথাগুলো বলা হচ্ছে। পাসপোর্ট হলো, আমরা যাকে বলি ট্রাভেল ডকুমেন্ট। তার মানে হলো যে, আমি যদি আজকে বিদেশে যেতে চাই তাহলে আমার একটা পাসপোর্ট লাগবে। বিদেশে যেতে না চাইলে আমার পাসপোর্টের কোনো দরকার নাই। তাই আমার পাসপোর্ট না থাকলে যে আমি বাংলাদেশের নাগরিক হব না, তার কোনো মানে নাই—এটা প্রথম কথা। আর দ্বিতীয় কথা হলো, (তারেক রহমান) পাসপোর্ট জমা যদি দিয়ে থাকেন, তার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। আমিও ২০ বছর দেশের বাইরে ছিলাম, বিভিন্ন সময় পাসপোর্ট নিয়ে অ্যাম্বাসিতে যেতে হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের কারণ থাকতে পারে। হ্যাঁ, কিছু কিছু দেশে আমাদের দেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের জন্য পাসপোর্ট জমা দিতে হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, তারেক রহমান তার নাগরিকত্ব পরিত্যাগের জন্য পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন কি না। তবে ওনারা যেটা বলছেন (আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে) সেটা ঠিক না।’
তারেক রহমানের আইনি নোটিশের বিষয়ে শাহদীন মালিক বলেন, ‘এটা ওনার আইজীবীরা বুঝবেন। পাসপোর্ট হলো নাগরিকত্বের একটা ডকুমেন্ট, সেটা যদি তিনি সারেন্ডার করেন, এমন কোনো দরখাস্ত যদি তারেক রহমানের না থাকে, সেক্ষেত্রে তারেক রহমানের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের বিষয়ে যা বলা হচ্ছে, তা তো টিকবে না।’
সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, ‘এসব অসত্য কথা বললে কী হয়, তা তারেক রহমানের আইনজীবীরা ভালো করেই জানেন। তো তার আইনজীবীরা হয়তো শাহরিয়ার আলম বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইবেন। আরেকটা জিনিস, যেটা আমার মনে হয় যে ইদানিং বারবার বলা হচ্ছে, তারেক রহমানেরও ব্যাপারটা স্পষ্ট করা দরকার। তবে আমি ধারণা করছি, উনি যুক্তরাজ্যে আমরা সাধারণ ভাষায় যেটাকে বলি পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম, মানে রাজনৈতিক আশ্রয়—তার আন্ডারে আছেন।’
শাহদীন মালিক বলেন, ‘আমার মনে হয়, ইংল্যান্ডে এখন পর্যন্ত ১০০ দেশের ১০, ২০, ৫০ হাজার লোক এ রকম পলিটিক্যাল অ্যাসাইলামের আন্ডারে আছেন। পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম মানে হলো, আমি যদি বিদেশে গিয়ে ওদেশের সরকারকে বলি যে, আমি জাতিগত, ধর্মগত, রাজনৈতিক কারণ বা আমার লিঙ্গের কারণে আমার দেশের সরকার দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছি; সরকার আমাকে আমার জাতিগত, ধর্মগত, রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে হেনস্তা করছে, আমাকের মামলা দিচ্ছে, আমাকে জেলে দিচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমি আপনার দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চাচ্ছি।’
তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইলে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া হতে পারে—জানতে চাইলে শাহদীন মালিক বলেন, ‘কোনো আইনি প্রক্রিয়া হতে পারে না। এই যেমন ধরেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আছে, এখন মিয়ানমার বলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে, প্রত্যাবর্সন! আমরা কী বলছি, যে ওরা ওখানে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে ওই দেশের নাগরিক হিসেবে থাকতে পারবে এমন যখন আমরা নিশ্চিত হব, তখন তাদের আমরা ওখানে পাঠাব। তখনই তাদের প্রত্যাবর্সনের ব্যবস্থা হবে।’
‘তো রাজনৈতিক আশ্রয়ের ব্যাপারে একই বিষয়, বাংলাদেশ সরকার চাইলেও ব্রিটিশ সরকারের যদি মনে না করে, কিংবা মনে করে যে ইনি (তারেক) দেশে ফিরে আসলে এই রাজনৈতিক নিগ্রহ নিপীড়নের শিকার হবেন। শুধু ব্রিটিশ সরকার না, রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া প্রত্যেক দেশের সরকারই নিশ্চিত হতে চাইবে যে, এই লোকটাকে যদি আমরা তার স্বদেশে ফেরত পাঠাই তাহলে সে কখনো নিগ্রহ বা নিপীড়নের শিকার হবে না। ওইটা ওই দেশ যতদিন পর্যন্ত মনে করবে না, ততদিন পর্যন্ত তারা ফেরত পাঠাবে না।’
শাহদীন মালিক বলেন , দেনদরবার করি বা অনুরোধ করি, কাজ হবে না। এটা হলো আইনের ব্যাপার। ওই দেশের সরকার তো আইনের বাইরে কিছু করবে না। এই ধরনের চেষ্টা করা যেতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়, বাংলাদেশ সরকারে যারা আইন জানেন-বোঝেন, তারা আইনে কী বলা আছে, এই ব্যাপারে সঠিক উপদেশ দেওয়া দরকার। যেটা আইনগতভাবে সম্ভব না, সেই পথে গিয়ে তো লাভ নাই।’
