একুশে বার্তা ডেক্স : প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা প্রশ্ন তুলে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণে যখন দেশে-বিদেশের সবাই খুশীতে উদ্বেলিত, তখন বিএনপির কেন এতো দুঃখ? এই স্যাটেলাইটের মালিকানা বাংলাদেশের, বাংলাদেশ সরকারের। যারা এর মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তোলে তারা অর্বাচিন। যাদের দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি ন্যূনতম ভালবাসা নেই, দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তারাই (বিএনপি) অর্বাচীনের মতো স্যাটেলাইটের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তুলে। বাংলাদেশের মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। দেশের এই অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত থাকে সেজন্য দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার শুরু হওয়ার সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে ’উৎক্ষেপিত স্যাটেলাইটের মালিক দুই ব্যক্তি’ বিএনপির এমন অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন প্রশ্নে তোলেন। তিনি বলেন, এটা অর্বাচীনের মতো কথা। স্যাটেলাইটের মালিকানা দুই ব্যক্তি হয় কীভাবে? আসলে এদের কোন দেশপ্রেম নেই। এ ধরণের মন্তব্য করা সত্যিই লজ্জাজনক। যাদের মধ্যে ন্যুনতম দেশপ্রেম আছে তারা কখনো এ ধরণের মন্তব্য করতে পারে না। তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসে ৫ বছরের মধ্যে দেশকে মহাকাশে নিয়ে যেতে পেরেছি। এখন সাগরের তলদেশ থেকে মহাকাশ পর্যন্ত বাংলাদেশের মর্যাদা উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছি। দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, এই অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতা যেন অব্যাহত রাখতে পারি।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, যেহেতু একটি স্যাটেলাইটের মেয়াদ ১৫ বছর, তাই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ নির্মাণের প্রস্তুতির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বের সকল নতুন প্রযুক্তিই বাংলাদেশ গ্রহণ করে এগিয়ে যাবে। দ্বিতীয় স্যাটেলাইট নিক্ষেপের পড় তৃতীয় স্যাটেলাইট প্রস্তুত করা হবে। এভাবে ধারাবাহিকভাবে দেশকে আধুনিক প্রযুক্তির ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাব। ভারত সফরকালে তিস্তা ইস্যু নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যে নিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের সম্পুরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, ’না বলা কথাটি রবে না গোপণে’।
সম্পুরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মালিকানা অবশ্যই বাংলাদেশের। বাংলাদেশ সরকারই এটার মালিক। যেভাবে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা হয়। তবে স্যাটেলাইট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যেহেতু বিভিন্নভাবে ব্যবহার হবে, যেমন টেলিমেডিসিন, ডিটিএইচ। এসব ক্ষেত্রে যে যতটুকু ভাড়া নেবে সেইটুকুর মালিক হবে, দু’জন ব্যক্তি তো এটার মালিক হতে পারে না। এ ধরণের মন্তব্য করাটও অত্যন্ত লজ্জাজনক। কোনো মানুষের যদি দেশের প্রতি ভালবাসা থাকে, স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নতভাবে মাথা উঁচু করে চলবে- যাদের মধ্যে এই ধরনের চিন্তা-চেতনা থাকে তারা কেউ কখনো ওই ধরণের মন্তব্য করতে পারে না।
সংসদ নেতা বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পর যেখানে দেশের সকল মানুষ খুশিতে উদ্বেলিত, দেশে-বিদেশে সব জায়গায় জয় বাংলা স্লোগাণে উদ্বেলিত। যখন উৎক্ষেপণ হলো সে এক অদ্ভুদ দৃশ্য। খুশিতে আমরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। পৃথিবীর কোনো দেশেই এভাবে খুশিতে উদ্বেলিত হতে দেখা যায়নি। যখন সকল মানুষ এতো খুশি তখন বিএনপির কোনো এতো দুঃখ?
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বেগম ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির সম্পুরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, সমুদ্রের তলদেশ থেকে মহাকাশ পর্যন্ত জয় করে বাংলাদেশ এখন উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত। কিন্তু ৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ দিন যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা স্যাটেলাইট নির্মাণের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি কেন? এদের (খালেদা জিয়া) চিন্তা এতো সংকীর্ণ ছিল যে, সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ বিনা পয়সায় দেওয়া হচ্ছিল, তা নেয়নি বিএনপি সরকার। তখন বিএনপি সরকারের কথা ছিল, সাবমেরিন সংযোগ নিলে নাকি সব তথ্য পাচার হয়ে যাবে! আমার প্রশ্ন, বিএনপির কাছে কী এমন গোপণ তথ্য থাকে যা ফাঁসের ভয়ে তারা দেশকে সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলো? তিনি বলেন, একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় এসে নতুন প্রজন্মের জন্য তথ্য-প্রযুক্তির দ্বার উম্মোচন করে দেয়।
ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির মূল প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশীল, স্বনির্ভর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট যোগাযোগের সূচনা করে। আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব আহমেদ জয়ের উদ্যোগে মহাশূণ্যে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পদক্ষেপ গ্রহন করি। স্বপ্নের স্যাটেলাইট নির্মাণ ও এর সফল উৎক্ষেপণে আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। মহাকাশে আজ বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে। এ গৌরব আমাদের সরকারের, এ গৌরব দেশের ১৬ কোটি মানুষের।
স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সরকারের গতিশীল উন্নয়নের অংশ ॥ একই প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ আওয়ামী লীগ সরকারের গতিশীল উন্নয়নের ধারাবাহিকতার একটি অংশ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সফল উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার আরেকটি স্বপ্ন পূরণ হলো। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করলো এক এলিট ক্লাবে। নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক দেশগুলোর এই ক্লাবে বাংলাদেশ ৫৭তম সদস্য। স্থল ও জলসীমা জয়ের পর মহাকাশ জয় ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘ যাত্রা। দীর্ঘ ৬ বছরের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে মহাকাশ জয় সম্ভব হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, স্যাটেলাইট টেকনোলজি ও সেবার প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাপক কর্মস্থান সৃষ্টি করবে। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবার পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-এডুকেশন, ডিটিএইচ, ভিস্যাট প্রভৃতি সেবা প্রদান করবে। দুর্গম অঞ্চলসহ সমগ্র বাংলাদেশের স্থল ও জলসীমায় নিরবিচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার নিশ্চিত হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারাদেশে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বহাল রাখা হবে।
তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এ মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার আছে। এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং ২০টি ট্রান্সপন্ডার লীজ দেয়া যাবে। ট্রান্সপন্ডার লীজ দিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। বিদেশী স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বর্তমানে প্রদেয় বার্ষিক প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর কাভারেজভূক্ত এলাকা হলো বাংলাদেশসহ সকল সার্কভূক্ত দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখিস্তান এবং উজবেকিস্তান। স্পেস টেকনোলজির জ্ঞান সমৃদ্ধ মর্যাদাশীল জাতি গঠনে অনবদ্য ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১।
বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে তালিকভূক্ত ॥ নূরজাহান বেগমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। বজ্রপাতে জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে সারাদেশে ১০ লাখ উঁচু গাছ (যেমন তালগাছ) রোপণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ৩২ লক্ষের অধিক তাল গাছ রোপণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া জাতীয় বিল্ডিং কোডে বজ্রপাত নিরোধক দন্ড স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য মাটিতে স্থাপিত পিলারের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভূমিকা রাখার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
