ড. এমাজউদ্দীন আহমদ : আমাদের কত বড় দুর্ভাগ্য। যে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে জনগণের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে, সমাজের বিভিন্ন দিকে রক্তের বন্যা বইয়ে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জনগণ যে সোনার বাংলাকে গণতন্ত্রের তীর্থক্ষেত্র রূপে গড়ে তুলতে চেয়েছেন মাত্র অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই সেই বাংলাদেশকে ২০১৮ সালের ২৩ মার্চ প্রকাশিত জার্মানির বার্টেলসমান স্টিফটাং (Bertelsmann Stiftung) সমীক্ষাকারী দলের সমীক্ষায় ব্র্যাকেট করা হয়েছে উগান্ডা, নিকারাগুয়া, মোজাম্বিক এবং লেবাননের সঙ্গে। এই পাঁচটি রাষ্ট্র গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় সর্বনিম্ন মানদ-ের একটিও এখন পূরণ করে না। লজ্জার কথা, বাংলাদেশ এখন প্রায় একটি স্বৈরতান্ত্রিক Autocratic State) রাষ্ট্র। ‘কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে’, ‘নির্বাচনে নেই সুষ্ঠুতা, নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা’, ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি অদম্য ক্ষুধা’ এবং ‘স্বৈরতান্ত্রিক শাসকরা দমন-পীড়নের মাত্রা ক্রমেই বাড়িয়ে চলেছে’ [It is by all means just autocrats who have been tightening the screw of repression.] যে ১২৯টি রাষ্ট্রে এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে সেসব রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যমূলক গুণ, বাজার অর্থনীতি এবং শাসনের প্রকৃতি গত ১২ বছরে বিশ্বের গড়পড়তায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে [The quality of democracy, market economy and governance has fallen to its lowest level in twelve years on a world average.]১২৯টি রাষ্ট্রের মধ্যে ৪০টি রাষ্ট্রের সরকার দুবছর ধরে আইনের শাসনকে আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করছে। ৫০টি রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে নিয়ন্ত্রণ এসেছে। অনেক দেশে শাসকরা বিশ্বময় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এসব প্রক্রিয়া গ্রহণ করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগণের সুবিধার্থে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। কোনো কোনো রাষ্ট্রে আবার উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতের মুখোমুখি হয়ে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
সমীক্ষকদের মতো অনেক সরকার সামাজিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা-সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় অনীহা প্রকাশ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল একবার ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার জন্য বিরোধী দল বা গ্রুপের সঙ্গে কোনো সংলাপ বা ডায়ালগে (Dialogue) যেতে রাজি হচ্ছে না। হাঙ্গেরি ও তুরস্কে এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায়। অনেক শাসক তাদের নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করার জন্য দমনমূলক নীতি গ্রহণ করছেন।
সমীক্ষকদের মত হলো, আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির অভাবই গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণ। এই গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, চরম দারিদ্র্য ও তীব্র সামাজিক বৈষম্যই ৭২টি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উন্নয়নকে ব্যাহত করেছে। এই ৭২টি রাষ্ট্রের ২২টিতে, যার অন্তর্ভুক্ত হলো ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভেনিজুয়েলা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পরিবর্তে গত ১০ বছরে ঘটেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অব-উন্নয়ন। ফলে অধিক পরিমাণ সাধারণ মানুষ অধিক বৈষম্যপূর্ণ এবং দমন-পীড়নের মধ্যে বসবাস করছে। এই মুহূর্তে বিশ্বে ৩.৩ বিলিয়ন (৩০০ কোটি ৩০ লাখ) মানুষ বাস করছে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এবং ৪.২ বিলিয়ন (৪০০ কোটি ২০ লাখ) মানুষ বসবাস করছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়।
১২৯টি রাষ্ট্রের মধ্যে এই সমীক্ষায় ৫৮টি রাষ্ট্রকে স্বৈরতান্ত্রিক এবং ৭১টি রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সমীক্ষকরা উল্লেখ করেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতেও গণঅধিকার অধিক পরমাণে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এবং আইনের রাজত্ব (Rule of law) আরও সঙ্কুচিত হচ্ছে। ব্রাজিল, পোল্যান্ড এবং তুরস্কের মতো গণতন্ত্রের প্রমাণিত ক্ষেত্রগুলোতেও ক্রমান্বয়ে স্বৈরতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য মাথা উঁচু করছে। এ ক্ষেত্রে বারকিনা ফাসো (Burkina Faso) এবং শ্রীলঙ্কা ব্যতিক্রম। এই দুটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের আলো ক্রমান্বয়ে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে অন্য ১৩টি রাষ্ট্রে, বিশেষ করে মোজাম্বিক, তুরস্ক ও ইয়েমেনে গণতন্ত্রের আলো নির্বাপিতপ্রায়। বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডায় গণতন্ত্রের বাতি নিভে গেছে। নির্বাচনব্যবস্থায় অনিয়ম এ জন্য প্রধানত দায়ী (It was often shortcomings in the quality of elections that tipped the balance.)
বিশ্বময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে ঘুণ ধরেছে তার ফলে সমাজে দুর্নীতি ও সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য প্রতিযোগিতার মাত্রা ভয়ঙ্করভাবে হ্রাস পাবে। এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ১২টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দুর্নীতি দমনে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে মাত্র একটির এই সক্ষমতা দেখা গেছে। ২৭টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দেখা যায় বাজার অর্থনীতির সুষ্ঠু বিধিবিধান চালু রয়েছে। কিন্তু স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মাত্র দুটিতে এই উদ্যোগ গৃহীত রয়েছে।
উপসংহারে বার্টেলসমান স্টিফটাংয়ের চেয়ারম্যান আরাট দ্য গিয়াসের (Arat De Geus) বক্তব্যটা তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেন, ‘বহু শাসক দমননীতির মাধ্যমে তাদের নেতৃত্বের দাবি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু এর পরিণতি ভয়ঙ্কর। আলোচনা-সংলাপের পরিবর্তে দমননীতির মাধ্যমে শাসন সব সময় অন্ধগলির মধ্যে নিয়ে যায় [Many rulers try to cement their claim to leadership through repressive measures. However, in the long run, ruling by coercion and not by dialog always leads to a dead end]
ড. এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়
