মাদক বিরোধি অভিযান : হত্যা কোনো সমাধান নয়

আলী মামুদ : দেশে ‘যুদ্ধাবস্থা’ না চললেও ‘বন্দুক-যুদ্ধাবস্থা’ চলছে। একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী গত ৫ মাসে ২২২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সন্দেহবশত লোকজনকে ধরে কোনো বিচার ছাড়াই হত্যা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে উভয় পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের সময় তারা নিহত হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা ‘মাদক-বড়ি’ নিয়ে যে রমরমা ব্যবসা, তা বর্তমান সরকারের সময়েই দিনদিন বেড়ে চলেছে। তা নিয়েই চলছে এই হত্যাকাণ্ড। এই ব্যবসার অন্যতম মূল হোতা কক্সবাজারের এমপি আবদুর রহমান বদি। তারই একজন দলীয় সুহৃদ ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামের রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের পর ওই বদিই নিরাপদে সঙ্গীসহ সৌদি আরব পাড়ি দিয়েছেন। এর আগে এক শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ মৃতুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন জেল খাটা অবস্থায় মুক্তি পেয়ে একইভাবে নিরাপদে বিদেশ পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছেন। এই যখন অবস্থা তখন বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণে ‘সতর্ক বার্তা’ দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের মানবাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও। দেশের ১০ বিশিষ্ট নাগরিক এক যৌথ বিবৃতিতে চলমান বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের দাবি জানিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন। মাদক প্রতিরোধের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক আইনবিষয়ক উপদেষ্টা, সুপ্রিম কোর্টবারের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক দিনকালকে বলেন, বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ডের পরও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানসহ এর সকল সদস্যের পদত্যাগ করা দরকার। সাবেক মন্ত্রী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ী নিধনের নামে নিরীহ মানুষদের হত্যা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলÑবাসদ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া গতকাল মঙ্গলবার দৈনিক দিনকালকে বলেন, সরকার মাদক সমস্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করাচ্ছে। এতে মাদক নিয়ন্ত্রণ হবে না। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন গত সোমবার রাতে চ্যানেল আইন-এর ‘তৃতীয় মাত্রায়’ এ সম্পর্কে বলেন যে, বিচার বিভাগের উচিত এই বিনা বিচারে হত্যা বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া। এইভাবে যে মানুষ হত্যা বেআইনি তাও ঘোষণা করা উচিত। : শরণার্থী ও মাদক দুটিই আসছে : আগের বার্মা ও হালের মিয়ানমার থেকে মাদক বড়ি ইয়া আগে থেকেই আসছে। তবে বর্তমান সরকারের আমলে এই মাদকÑঢল বেড়েছে। একদিকে শরণার্থী অন্যদিকে ইয়াবা দুটি আসছে অবাধে। এই মাদক বড়ি আগ্রাসনে যে মিয়ানমারের শাসক গোষ্ঠীর অনুমোদন রয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা মূল্যে সুলভ এই বড়ি খেলে তরুণদের রক্ত চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কান্তহীনভাবেই নাকি চলাফেলা করা যায়। রাতেও ঘুম আসে না। এক শ্রেণির তরুণদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। অভিজাতদের বাড়িতে বাড়িতে ‘হোম-সার্ভিসও দেয়া হয় এই উত্তেজক বড়ি। গণপরিবহন ড্রাইভাররাও এর গ্রাহক। : শুধু শহর নয় প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে বেড়ে চলেছে এই নেশাদার বড়ির অবাধ ব্যবহার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়ে এই নেশাদার বড়ির ব্যবহার বেড়েই চলেছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও রয়েছে এই ব্যবসার সুবিধা পাওয়া লোকজন। তারা ধরা পড়ছেন। : সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বেশ কয়েকটি জরিপ চালিয়ে পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক তথ্য। এতে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যসহ প্রভাবশালী লোকজনের নাম উঠে এসেছে। জাতীয় সংসদেও বলা হয়েছে যে এই মাদক বড়ির ব্যবসার গডফাদার এই সংসদেই রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা সাবেক ‘স্বৈরাচার’ এইচএম এরশাদ একথা বলেছেন সংসদে। কিন্তু তাদের বিরত করা যায়নি এই মরণঘাতি ব্যবসা থেকে। বিশেষ করে সরকারি মহল দেশকে ‘উন্নয়নশীল’ তকমায় উন্নীত করতে গিয়ে এদিকটাই তেমন নজির দিতে পারেনি। : বিচারবহির্ভূত হত্যা যে কারণে : কিন্তু বন্দুকযুদ্ধ নামের বেআইনি এক উপদ্রব দেখা দিয়েছে। বিনা বিচারে হত্যার মত বেআইনি তৎপরতা শুরু করা হয়। এই পদ্ধতিতে নিরপরাধ লোকও নিহত হতে পারে। অন্য কোনো বিরোধ বা শত্রুতার কারণে লক্ষ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে প্রতিপক্ষকে হত্যা করানো যেতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও হত্যা করা হতে পারে। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। কথিত বন্দুকযুদ্ধে সেখানকার পৌর কাউন্সিলর ও স্থানীয় যুবলীগের সাবেক সভাপতি মোঃ একরামুল হক নিহত হয়েছেন। বিবিসি-লন্ডন জানিয়েছে, মাদক বিরোধী যুদ্ধে গত ২৬ মে একরামুল হক নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রাক্কালে তার কথাবার্তার একটি অডিও সূত্রে পাওয়া গেছে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রামাণ্য। আদালতে এই অডিও-প্রামাণ্য হিসেবে গৃহীত হবে কিনা সেটাও অবশ্য দেখার বিষয়। নিহত একরামুল হকের স্ত্রী আয়শা বেগম বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, তাদের দুই মেয়ে তাদের পিতার সঙ্গে কথা বলেছেন। এসব কথাবার্তায় মাদক নয়, বরং একটি জমির বিষয়ে কথা রয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য বলেছেন যে, এই মাদক বিরোধী অভিযানের রয়েছে ভিন্ন উদ্দেশ্য। এদিকে ড. আনিসুজ্জামান, কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, বিশিষ্ট নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, কবি নির্মূলেন্দু গুণসহ ১০ জন বিশিষ্ট নাগরিক বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের আহবান জানিয়েছেন। গত ৩ জুন-১৮তে প্রকাশিত (দৈনিক দিনকালের প্রথম পৃষ্ঠা) ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার আহবান ১০ বিশিষ্ট নাগরিকের’ শীর্ষক খবরে জানা যায় যে, তারা যতদ্রুত সম্ভব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এই যৌথ বিবৃতিদাতারা বর্তমান সরকারপন্থী হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু তাদের এই যৌথ দাবি অর্থাৎ বিচারবহির্ভূত হত্যকাণ্ডের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে না। তবু সেটি দেখার জন্য অপেক্ষা করা যেতে পারে। : মানবাধিকার কমিশনের পদত্যাগ করা উচিতÑব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : এ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টবারের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দৈনিক দিনকালকে বলেন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নামে একটি সংস্থা আছে। তাদের কি কাজ। তাদের উচিত পদত্যাগ করা। কারণ বিনা বিচারে মানুষ হত্যা সভ্য সমাজে চলতে পারে না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আইনের শাসনের জন্য হুমকি। : বিনা বিচারে মানুষ হত্যা নয়Ñআবদুল্লাহ আল নোমান : সাবেক মন্ত্রী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান গত সোমবার একটি অনুষ্ঠানে বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের নিধনের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। টেকনাফের একরাম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন,্ কেটি গণতান্ত্রিক সমাজে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড অমানবিক। তিনি বলেন, মাদক বিরোধী অভিযানের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা বন্ধ হওয়া দরকার। : প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের ধরা হোকÑখালেকুজ্জামান ভূঁইয়া : বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলÑবাসদ সম্পাদক খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া দিনকালকে বলেন, গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসকাবের সামনে এনিয়ে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠান করেছেন তারা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যে মাদক ব্যবসা চলছে, তা হঠাৎ করে বন্ধ হবে না। বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করেও মাদক ব্যবসা বন্ধ হবে না। যারা প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ী তাদের আইনের আওতায় নিতে হবে। : আইনের শাসন চাইÑব্যারিস্টার সারোয়ার হোসেন : লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি (অনার্স) লন্ডনের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিজিডিএল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসএস ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন দৈনিক দিনকালকে গতকাল মঙ্গলবার বলেন, বিনা বিচারে মানুষ হত্যা আইনের শাসনের পরিপন্থী। দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পিরোজপুরের সন্তান জনাব সারোয়ার বলেন, আমরা আইনের শাসন চাই, বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড নয়।