রুট পরিবর্তন করে এখনো আসছে ইয়াবা চালান : জলে-স্থলে ইয়াবা নিয়ন্ত্রণকারি বদিরই নাম

একুশে বার্তা ডেক্স : দেশব্যাপী মাদকের বিস্তার রোধে চলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিরো টলারেন্স অভিযান। কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত মাদক কারবারির তালিকা প্রতিদিনই দীর্ঘতর হচ্ছে। কঠোরতম এই অবস্থানের মধ্যেও থেমে নেই ইয়াবা পাচার। দেশে ইয়াবা প্রবেশে স্থলপথের সম্ভাব্য রুটগুলো অনেকটাই নিশ্ছিদ্র করা হলেও গহিন অরণ্য, দুর্গম পাহাড় আর গভীর সমুদ্রাঞ্চল হয়ে আসছে মরণঘাতী এই বড়ির চালান; ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশে। আর এহেন হীনকর্মের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে শুধু

স্থানীয় অধিবাসীই নন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও বরাবরের মতো উঠে আসছে একটি নাম আব্দুর রহমান বদি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় এই সাংসদের অদৃশ্য ইশারায়ই দেশজুড়ে এখনো অব্যাহত আছে ইয়াবার বিস্তার। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ বলছেন, মাদক সম্রাট সংসদেই আছে।

মিয়ানমার থেকে ইয়াবা প্রবেশের প্রধান রুট কক্সবাজার। জেলাটিতে গত ২৯ মে  মঙ্গলবার পর্যন্ত গত দশ দিনে ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৩৮৪ পিস ইয়াবা বড়ি জব্দসহ ১৩০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে শুধু টেকনাফেই উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৬৫০ পিস। এসব ঘটনায় হয়েছে ১০৬টি মামলা।

কক্সবাজারে কতর্ব্যরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বলছেন, বন্দুকযুদ্ধ কিংবা আটকের ভয়ে স্থলরুট ব্যবহার কমে গেছে। তবে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ রুট হয়ে ইয়াবা চোরাচালান অব্যাহত আছে। ইয়াবা কারবারি সিন্ডিকেটের শীর্ষপর্যায়ের অনেকেই কঠোর অভিযানের কারণে আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের লোকজন এখনো দেদারসে কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি, পিতা-মৃত এজাহার কোম্পানি, চৌধুরীপাড়া, টেকনাফ পৌরসভা। নেপথ্যে ইয়াবা নিয়ন্ত্রণকারী। সরকারি দলের এমপি হওয়ার সুবাদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারী নিয়ে তিনি ইচ্ছামতো এ কাজটি করে থাকেন। অন্যান্য শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ীগণ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসা করার দুঃসাহস দেখাবে না মর্মে মন্তব্য অত্যুক্তি হয় না। এলাকার/জেলার অন্যান্য শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বা চাঁদাবাজ এলাকায় প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হবে না। বিশেষত মিয়ানমার হতে আনা ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করার জন্য তার ইচ্ছাশক্তি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অন্যান্য মাদক ব্যবসায়ী ভয়ে ব্যবসা বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।’

প্রতিবেদনে শীর্ষ মাদক কারবারির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা যুক্ত করা হয়েছে। এতে সাংসদ বদি ছাড়াও ৫২ জনের নাম রয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বদির ভাই মৌলভি মুজিবুর রহমান, মো. আব্দুস শুক্কুর, মো.ফয়সাল, আব্দুল আমিন, সৎভাই মো. সফিক, ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল, বেহাই শাহেদ কামাল, ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপু, বদির ব্যক্তিগত সহকারী মং মং সেন। এদের মধ্যে মং মং সেনের কাজ হচ্ছে মাঠপর্যায়ের ইয়াবা কারবারি আর বদির মধ্যে লিয়াজোঁ করা।

গডফাদারের তালিকায় এমপির পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের বাইরে আছে টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ও তার দুই ছেলের নাম। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন তিনি। পরে এমপি বদির হাত ধরে তিনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এমপি বদি নিজে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে ইয়াবা কারবার করেন না। তবে নিকটজন ও তার নিজের রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্টদের মাধ্যমে তিনি এ কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন এবং লাভের অংশ বা চাঁদা আদায় করে থাকেন। এ কারণে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর জালে তাকে ধরা যাচ্ছে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নাফ নদী ডিঙিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে জাদীরমুরা পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথে ৩০টি স্পটকে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার প্রবেশপথ (এন্ট্রি পয়েন্ট) হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। রুটগুলো হলো: শাহপরীর দ্বীপ, বর্মাপাড়া, নাজিরপাড়া, জালিয়াপাড়া, সাবরাং, নাইট্যংপাড়া, চৌধুরীপাড়া, কাটাখালী, ইনসিপ্রাং, হোয়াইক্যং ঘাট, হ্নীলা, জাদিমুরা, উকিলপাড়া, বোমপাড়া, মৌলভিপাড়া, শিলবনিয়াপাড়া, চকবাজার, অলিয়াবাদ, খানকার পাড়া, ফরায়েজী পাড়া, পুরান ট্রানজিট ঘাট, কুলালপাড়া, কায়ুকখালী (কে কে) খাল, দমদমিয়া, কেরুনতলী, ১৪ নম্বর জাহাজ ঘাট এবং এক, দুই, আড়াই ও তিন নম্বর সুইসগেট।

এর মধ্যে অন্যতম রুট সাবরাংকে ব্যবহার করেন বদির বেয়াই শাহেদ কামাল। একই অভিযোগে অভিযুক্ত বদির আরেক বেয়াই আকতার কামাল ইতোমধ্যে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। স্থলপথে সবচেয়ে বড় এ রুটের মূল নিয়ন্ত্রণকর্তা বদির ভাগ্নে সাহেদুর রহমান নিপু। দেশজুড়ে ইয়াবা সরবরাহ করেন তিনি। এ ছাড়া এর উপচক্রে নাম আছে মোয়াজ্জেম হোসেন দানু মেম্বার, সামসু মেম্বার ও সৈয়দ হোসেনের।

সাবরাং থেকে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রামে চালান পাঠান কচুবুনিয়ার মৌলভি বশির প্রামাণিক ওরফে ডাইলা, মৌলভি বোরহান উদ্দিন, শাহআলম, আব্দুর রহমান, শামুসল আলম মার্কিন, হাবিব উল্লাহ হাবিব।

টেকনাফের চৌধুরীপাড়ায় সাংসদ বদির বাড়ি। এর পেছনেই জালিয়াপাড়া। এই রুটটি সরাসরি পরিচালনা করেন বদির ভাই টেকনাফ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মৌলভি মুজিবুর রহমান এবং তার সৎভাই মো. সফিক। ঢাকায় বসে তিনি রাজধানীসহ চট্টগ্রামে ইয়াবা চালান নিয়ন্ত্রণ করেন। চৌধুরীপাড়া থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ইয়াবা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন জাফর ওরফে টিটি জাফর ও তার ভাই গফুর। তাদের হয়ে কাজ করেন সালমান, হাসান আলী, ইমান শরীফ, জুবায়ের, মোহাম্মদ হোসেন ওরফে বর্মাইয়া হোসেন, মুুসু। নাফ নদীতীরবর্তী মৌলভিপাড়া ও নাজিরপাড়াকে রুট হিসেবে ব্যবহার করেন ইউপি মেম্বার এনামুল হক, আব্দুর রহমান, ভুট্টো, একরাম।

রোহিঙ্গাদের দিয়ে ইয়াবা পাচার করান বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মৌলভি আজিজ, জিয়াউর রহমান, টেকনাফ পৌরসভা পুরান বল্লাপাড়ার আব্দুল হাকিম প্রকাশ, নির্মল ধর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, স্থলপথে কড়াকড়ি থাকায় ইয়াবা কারবারিরা বর্তমানে নৌপথেও চালান নিয়ে আসছে। মিয়ানমার থেকে সমুদ্রপথ হয়ে ইয়াবার চালান আসে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভে। এ ছাড়া মহেষখালী-কুতুবদিয়ার গভীর সমুদ্রাঞ্চল ব্যবহার করে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও খুলনায় ইয়াবার পাচার চলে। কক্সবাজারের সাগরপথে মেরিন ড্রাইভ বা উপকূ’লীয় রুটের নিয়ন্ত্রক টেকনাফ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া। এ ছাড়া দিদার মিয়া, আব্দুল্লাহ মেম্বার, বাহাদুর, আব্দুল হাকিম, হামিদ মেম্বার ওরফে হামিদ ডাকাত, সাহাবুদ্দিন সাবু, লম্বরী গ্রামের সাবেক মেম্বার মীর কাশেম আলীর নামও রয়েছে এ রুটে পাচারকারীর তালিকায়।

একেক সময়ে একেক রুট এবং নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরাসরি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য জেলায় ইয়াবা ছড়িয়ে দেন হ্নীলার আব্দুল হামিদ, সৈয়দ আহম্মদ ছৈয়তু, হাসান আব্দুল্লাহ, মুহাম্মদ শাহ মালু, গোদার বিলের আলী আহাম্মদ চেয়ারম্যানের ছেলে আব্দুর রহমান। অন্য রুটগুলোও পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে সুবিধামতো ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারকারী চক্রের সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কক্সবাজার সদরের ইয়াবা রুট রাখাইনপাড়া গোলদীঘির পাড়, বৌদ্ধমন্দির (ক্যাং টেম্পল), চালবাজার বস্তি, পাহাড়তলী, কলাতলী, পাহাড়ি এলাকা, মাঝের ঘাট, কক্সবাজার বিমানবন্দর সংলগ্ন নাজিরাটেক বস্তি এলাকা। এসব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে পশ্চিম মাছবাজারের আউশা রাখাইন, রাখাইনপাড়ার লাচিং প্রু মার্মা চশমানি, চপ্রু রাখাইন। এদের নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রলীগ-যুবলীগের একাধিক স্থানীয় নেতা।

উখিয়ায় মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পালংখালী, বালুখালী, ঘুমধুম, রেজুপাড়া, তমব্রুর দুর্গম পর্বতাঞ্চলের রুটগুলো বদির লোকজন ব্যবহার করে সাধারণত টেকনাফে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভীষণরকম কড়াকড়ি অভিযান চললে।

বান্দরবানের লামা, আলীকদমের দুর্গম পাহাড় ছাড়াও নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়ি ইউনিয়ন, ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু আমতলী ঘুমধুম, তমব্রু, বেতবুনিয়া, আশারতলী, চাকঢালী, ফুলতলী, দোছড়ি ইউনিয়নের লেবুছড়ি, বার্মাপাড়া হয়েও আসছে ইয়াবার চালান। মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয় এসব চালান আনার ক্ষেত্রে। টেকনাফে, চট্টগ্রামে ও ঢাকায় বসে এসব রুটের সব চালান নিয়ন্ত্রণ করেন বদির ঘনিষ্ঠজনরা। আর সেসব ঘনিষ্ঠজনের নিয়ন্ত্রণ করেন খোদ বদি।